ট্রান্সজেন্ডারিজমের করাল গ্রাস: উপসংহার

ট্রান্সজেন্ডারিজমের করাল গ্রাস: উপসংহার

 

সূচিপত্র

ভূমিকা
অধ্যায় ১: একটি সহজ প্রশ্ন
অধ্যায় ২: জেন্ডার থিওরির ইতিহাস
অধ্যায় ৩: জন মানি
অধ্যায় ৪: কীভাবে কারিকুলামে জেন্ডার থিওরি ঢুকে গেলো
অধ্যায় ৫: ট্রান্সজেন্ডাররা যেভাবে সব দখল করে নিলো
অধ্যায় ৬: ট্রানজিশনের প্রতিশ্রুতি
অধ্যায় ৭: তাসের ঘরের পতন
অধ্যায় ৮: ট্রান্সজেন্ডার সাংস্কৃতিক সংঘাত
অধ্যায় ৯: গোলাপি পুলিশ স্টেটের বুটের চাপায় ধ্বংস
অধ্যায় ১০: বিদ্রোহ
উপসংহার: আফ্রিকা
কিন্তু
রেফারেন্স

 

উপসংহার

আফ্রিকা

পাঁচ ঘণ্টা ড্রাইভের পরে আমরা একটা উঁচুনিচু রাস্তায় এসে পড়লাম। আমাদের আরো এক ঘণ্টা লাগবে। সত্য বলতে এ বালিময় রাস্তা আমরা যে মসৃণ হাইওয়ে ছেড়ে এসেছি তার চেয়ে খুব বেশি খারাপ না। আমার মিশন আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে, তাই অভিযোগের কিছু নেই। আমি বরং উৎসাহী ছিলাম। আমি সবকিছু থেকে অনেক দূরে চলে এসেছি: সভ্যতা থেকে দূরে, এয়ার কন্ডিশন থেকে দূরে, সেল সার্ভিস, ট্যাপের পানি, সেলফি তোলা লোকজন- সবকিছু থেকে অনেক অনেক দূরে। সবচেয়ে জরুরি হলো, আমার উদ্দেশ্য থেকে আমি এখন পশ্চিমা সভ্যতা থেকে অনেক অনেক দূরে। আমি মাসাই জাতির সাথে দেখা করতে যাচ্ছি যারা কিনা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একইভাবে দেখে আসছে। আফ্রিকার কেনিয়া ও তানজিনিয়ার সীমান্তে তাদের বসবাস। তারা থাকে কাদা দিয়ে বানানো ঘরে থাকে, যার ছাদ হলো খড় দিয়ে বানানো। তারা গরু পালে, শিকার করে এবং সন্তানদেরকে তাই করতে শেখায়।

গত কয়েক বছরে আমি শিখেছি যে, জেন্ডার আদর্শ পুরোপুরি আধুনিক পশ্চিমে জন্ম। এ আদর্শের অনুসারীরা দেখাতে চায় যে তাদের দাবি আসলে বৈজ্ঞানিক এবং মানুষের সহজাত প্রবণতা নাকি এমনই। সত্য হলো, এটা হলো তাদের কল্পনার রাজ্য যা মনগড়া ভাষা ও নীতি দিয়ে চলে। আমি শীঘ্রই দেখতে যাচ্ছি জেন্ডার আদর্শ পুরো প্রকৃতিবিরোধী এবং অজ্ঞাত। আমি তাদের সাথে কথা বলতে যাচ্ছি যাদের কাছে মাস মিডিয়া, পপ কালচার এবং আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা পৌঁছেনি। তাদের সাথে কথা বলেই কেবল বিষয়টা পরিষ্কার করা যায়।

এজন্য আমি আফ্রিকা এসেছি। আমি এমন মানুষের সাথে কথা বলতে এসেছি যারা লিঙ্গপরিবর্তন সার্জারি ও হরমোন চাপিয়ে রাখা ওষুধের নাম শোনেনি। আমি এমন মানুষের সাথে কথা বলবো যাদেরকে কোনো ‘অভিজ্ঞ’ মানুষ এসে ‘লিঙ্গ’ এবং ‘জেন্ডার’এর পার্থক্য শিখিয়ে যায়নি। তারা এমন মানুষ যারা কোনোদিন তাদের মেইলের সিগন্যাচারে He কে She লিখবে না, কারণ তাদের ইমেইলই নেই। এখানেই হয়তো আমি সরাসরি দেখতে পারবো জেন্ডার থিওরি আসলে কতটা ‘সহজাত’। এখানে এসেই প্রমাণ হবে যে জেন্ডার থিওরি দেওয়া মানুষগুলো মানসিকভাবে অসুস্থ নাকি আমি নিজেই তা।

আমার অনুবাদক (সে নিজের নাম বলেছে ‘পল’ যাতে আমার মত পশ্চিমার তার নাম উচ্চারণ করতে কোনো সমস্যা না হয়) আমাকে গ্রামে নিয়ে গেলো। আমাকে তারা উদারভাবে এবং দয়ার সাথে স্বাগত জানিয়েছে। পল আমাকে গ্রামের এক গুরুজনের কাছে নিয়ে গেলো। তার আশেপাশে বেশ কিছু লোক ছিল। বেশ কিছু বিনোদন ও আড্ডার পরে আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, পুরুষ বলতে তিনি কী বোঝেন। প্রশ্নটা শুনে তাকে মোটেই বিভ্রান্ত মনে হলো না। অনুবাদক বললো, ‘আমাদের এখানে পুরুষ মানুষ বলতে আপনার কাছে একটা ছুরি, বর্শা ও লাঠি থাকতে হবে। এছাড়াও আপনার নিজের গ্রাম নিজেই বানাতে হবে। তারপর আপনি বিয়ে করবেন, একটি পরিবার পাবেন ও তাদেরকে সে গ্রামে রাখবেন। আপনার গরু পালতে হবে যেন আপনার সন্তানরা যথেষ্ট দুধ পায়। আপনার কম্যিউনিটিতে টিকে থাকতে হবে।’

তাদের কাছে পুরুষত্ব কিছু কাজ দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা হয়। অনেক জেন্ডার থিওরিস্ট হয়তো এটার সাথে একমত হবে। তাই আমি সে গুরুজনকে জিজ্ঞেস করলাম, কোনো পুরুষ চাইলে মেয়ের কাজ করতে পারবে কিনা। অনুবাদক জানালো, ‘মাসাই জনগোষ্ঠীতে সে পারবে না।’

‘একজন পুরুষ কি নারী হতে পারে?’

‘না।’

‘ট্রান্সজেন্ডারের ক্ষেত্রে কী হবে?’ আমার অনুবাদক বুঝতে না পেরে আমার দিকে তাকালো। ‘ট্রান্সজেন্ডার,’ আমি আবার বললাম।

সে এ ধারণাটা মাসাই লোকদেরকে নিজ ভাষায় বোঝানোর চেষ্টা করলো।

‘না। যদি আপনি পুরুষ হন এবং মেয়ে হতে চান তাহলে আপনার মাথায় সমস্যা আছে। আপনার পরিবার ও আপনার মধ্যেও সমস্যা আছে।’

‘কেউ যদি নন-বাইনারি (অর্থাৎ নারীও না, পুরুষও না) হয়?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।

পল আমার দিকে তাকালো। বিভ্রান্তিতে তার ভ্রু কুঁচকে গেলো।

‘নন-বাইনারি’ আমি বোঝাতে চাইলাম। আমি বুঝতে পারলাম সে কখনো নন-বাইনারির কথা শোনেইনি। কেনই বা শুনবে?

‘আপনি পুরুষও না, নারীও না?’ সে জিজ্ঞেস করলো।

‘হ্যাঁ, কেউই না। মানে তারা অন্য কিছু,’ আমি বললাম। আমি বুঝলাম যে যদি এসব অস্বাভাবিক হাস্যকর ধারণা আপনি সাধারণ কিছু শব্দে বললে আসলেই কেউ কিছু বোঝার কথা না। জেন্ডার থিওরিস্টরা একটা ডিকশনারিই বানিয়েছে তাদের এসব ধারণা বোঝাতে। পৃথিবীর ইতিহাসে কেউ এসব ধারণা সম্পর্কে জানতোই না।

‘তিনি বলছেন, আমরা এমন কিছু কখনো দেখিনি,’ পল বললো।

হয়তো আমি জেন্ডার থিওরির ভাষা বেশি দ্রুত ব্যবহার করে ফেলেছি। আমি মূল কথায় ফিরে গেলাম, ‘আপনি কীভাবে জানেন যে আপনি পুরুষ?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।

আমি ভাবলাম আমি তাদেরকে প্রথমে জিজ্ঞেস করলাম পুরুষ কী, তারা আমাকে সমাজে পুরুষের কিছু কাজের কথা বললো। এটা কিন্তু জেন্ডারের কারণে না। তারা মনে করে না জেন্ডার মানেই নির্দিষ্ট কিছু দায়িত্ব পালন করা। বরং তারা ধরে নিয়েছে আমি জেন্ডার রোল নিয়ে কথা বলছি কারণ জৈবিকভাবে নারী-পুরুষের সংজ্ঞা আসলে জিজ্ঞেস করার মত কিছুই না। মানুষ যে লিঙ্গ নিয়ে জন্মেছে তা বাদে অন্য কোনো লিঙ্গ নিজেকে ভাবতে পারে এটাই তাদের কাছে অবাক করা। তারা যখনই বুঝতে পেরেছে যে আমি তাদেরকে আরো মৌলিক প্রশ্ন করছি, তারা জবাব দিতে দুইবার ভাবেনি।

‘যখন কেউ জন্ম নেই, তার পুরুষাঙ্গ থাকলেই আমরা বুঝতে পারি সে পুরুষ। আর নারীর থাকবে যোনি।’

আমি সেখানের এক গ্রুপ নারীর সাথে কথা বললাম। তারাও পুরুষদের মতই জেন্ডার সম্পর্কে ভাবে। যে নারীদের সাথে আমি কথা বলছি তারা খুব সুন্দর কিছু গয়না পরা। তাই আমি আমার আলোচনা একটা ভিন্ন দিক দিয়ে নিয়ে আসলাম।

‘আমাদের দেশে,’ আমি তাদেরকে বললাম, ‘কিছু মানুষ আছে যারা মেয়েদের পোশাক পরে আর বলে যে তারা নারী। সেটা নিয়ে আপনারা কী ভাবছেন?’

পল তাদেরকে বুঝিয়ে বললেন। একটু পরে নারীদের কথা অনুবাদক আমাকে বুঝিয়ে বললেন, ‘তারা বলেছে তারা এমন কিছু কখনো দেখেনি বা শোনেনি।’

‘আচ্ছা নারীর যদি সংজ্ঞা দিতে বলা হয়, আপনারা কীভাবে দেবেন?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।

পল অনুবাদ শুরু করলো, ‘পুরুষের কোনো স্তন থাকবে না। দ্বিতীয়ত, তাদের গোপনাঙ্গ ভিন্ন। কারণ পুরুষের থাকবে পুরুষাঙ্গ আর নারীর থাকবে যোনি। আবার নারী বাচ্চা জন্ম দেয়, পুরুষ তা পারে না।’

‘আপনাদের একটু শক লাগতে পারে,’ আমি বললাম, ‘কিন্তু আমাদের সংস্কৃতিতে কিছু মেয়ে আছে যারা তাদের দেহ থেকে বিভিন্ন অংশ কেটে ফেলে। যেমন তারা স্তন কেটে ফেলে দেয়। এভাবে কি তারা পুরুষ হয়ে যায়?’

তিনি এটাতে মোটেই সন্তুষ্ট হলেন না। ‘যৌনসম্পর্কের সময় এটা তো সমস্যা,’ তিনি বললেন, ‘কোনো পুরুষের সাথে শারীরিক সম্পর্ক করার সময় যেকোনো মেয়ে আশা করবে যে তার পুরুষাঙ্গ থাকবে।’

আসলে, এটার জবাব দেওয়া যায় না। মাসাইয়ের লোকদের সাথে কথা বলে বোঝা গেলো, জেন্ডারে বাইনারি ভার্সন, অর্থাৎ কেবল পুরুষ ও নারীর ধারণাতেই তারা বিশ্বাস করে। তাদের নন-বাইনারি বা ট্রান্সজেন্ডারিজম সম্পর্ক কোনো ধারণাই নেই। সত্য বলতে এমন মানুষকে ট্রান্সজেন্ডারিজম সম্পর্কে বোঝানো অনেক কষ্ট যিনি বাস্তব চোখে পৃথিবীকে দেখেন। তার কাছে একদমই পরিষ্কার যে লিঙ্গ আসলে দুটো, এবং এর বাইরে আর কিছুই তার কাছে কোনো ব্যাপার না। যখনই আপনি তাদেরকে এসব বোঝাতে যাবেন আর বলবেন যে তাদের উচিত না তাদের চোখকে বিশ্বাস করা, আপনি বুঝবেন যে জেন্ডার আদর্শের পুরো ধারণা কতটা ফাঁকা, কতটা মিথ্যা।

যদিও বলা হচ্ছে যে ‘জেন্ডার’ একটি সামাজিক সৃষ্টি, অথচ প্রকৃত সত্য হচ্ছে জেন্ডার থিওরি নিজেই সবচেয়ে বড় ও জটিল এক সামাজিক সৃষ্টি। দর্শন, ভাষা, সংস্কৃতি এবং যেই চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি দরকার জেন্ডার থিওরিকে বাস্তবায়নের জন্য, এই সবগুলোর বিশাল টাওয়ার দাঁড় করানো হয়েছে যেন এই থিওরিকে টিকিয়ে রাখা যায়। আমাদের আশেপাশে সামাজিকভাবে তৈরি করা এই মানসিক জেলখানা থেকে বের হয়ে আসলে আপনি বুঝতে পারবেন জেন্ডার আদর্শ আসলে পশ্চিমাদের বিশেষাধিকার, বিলাসিতা এবং অবক্ষয় একটি প্রোডাক্ট। এমন এক সমাজ যেখানে অভিজ্ঞ সেক্সোলজিস্ট, ফেলোপ্লাস্টি সার্জন, জেন্ডার স্টাডিজ প্রফেসর ও অদ্ভুত এফার্মিং কাউন্সিলকে সমর্থন করা মানুষের পক্ষে সম্ভব না, সেখানে জেন্ডার আইডিওলজি তৈরি হবে না।

এটা সম্পর্কে শুধু প্রশ্ন করার কারণেই মাসাই লোকরা আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়েছিল যেন আমি কোনো এলিয়েন বা পাগল।

‘কী হবে যদি নারীর পুরুষাঙ্গ থাকে?’ আমি সেখানকার এক দল মানুষকে জিজ্ঞেস করলাম।

‘কীহ?!’ আমার দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে আশ্চর্য হয়ে বলে উঠলো পল। সে নিশ্চিত হচ্ছিলো আমি ভুলে এটা বলে ফেলেছি কিনা।

‘আমি যেখান থেকে এসেছি, মানে আমেরিকা, সেখানে অনেক মানুষের পুরুষাঙ্গ থাকা সত্ত্বেও তারা নিজেকে নারী দাবি করে।’

পুরো দলের সবাই হাসা শুরু করলো। তারা আমাকে উপহাস করছিল না। আমার কথা আসলে এতটাই হাস্যকর ছিল যে তারা না হেসে পারলো না।

‘তারা বলছে তারা হাসছে কারণ তারা এমন কোনো কিছু কোনোদিন দেখেনি, শোনেওনি,’ পল আমাকে বললো।

আমি কিছুটা উত্তেজিত হয়ে আশেপাশে তাকালাম। আমি যা নিয়ে কথা বলছি তা মাসাই লোকরা কোনোদিন শোনেনি, দেখেনি। ‘আমার দেশে আমি একদিনও এসব না শুনে কাটাতে পারি না। আমাদের প্রতিদিন এসব শুনতে হয়,’ আমি বললাম। ‘আমি যা বললাম তার উপর নির্ভর করে বললে, আপনারা কোনোদিন আমেরিকা যেতে চান?’

তারা আবার আগের চেয়েও জোরে হাসা শুরু করলো। তাদের উত্তর ভাবাও লাগেনি।

‘তারা বলেছে, না। কখনোই না,’ পল বললো।

ট্রান্সজেন্ডারিজমের ধারণা তাদের কাছে এতটাই অপরিচিত ছিল যে আমি যে একদল পুরুষের সাথে কথা বলছিলাম তারাই বরং আমাকে প্রশ্ন করা শুরু করলো, আমার ইন্টারভিউ নেওয়া শুরু করলো। আমি যে ধারণা নিয়ে কথা বললাম সেগুলো এতটাই অপ্রাকৃত যে এগুলো কোনোদিন মাসাই লোকদের মাথায়ই আসেনি। ‘আচ্ছা কীভাবে একটা মহিলা পুরুষ হয়ে যায় আবার বলুন তো,’ তারা জিজ্ঞেস করলো

‘আমি জানি না,’ আমি খুব সিরিয়াসভাবে জবাব দিলাম, ‘মনে হয় তারা এটা অনুভব করে। তারা শুধু ভাবে। আমার দেশে ধরুন কোনো এক পুরুষ বললো, ‘আমি একজন মহিলা যে পুরুষের দেহে আটকা পড়ে আছি।’

‘আপনারা তাদের সাথে কীভাবে ব্যবহার করেন?’ পেছন থেকে একজন জিজ্ঞেস করলো।

‘আসলে,’ আমি জবাব দিলাম, ‘আমাদের দেশের অনেক মানুষ বলে যে কোনো পুরুষ যদি বলে সে নারী, তাহলে তার সাথে নারীর মতই ব্যবহার করতে হবে।’

‘তার কি স্তন আছে?’ ‘তার কি যোনি আছে?’ ‘সে কি বাচ্চা জন্ম দেয়?’ ‘তার কি পিরিয়ড হয়?’ এ ধরনের প্রশ্ন করছিলেন তাদের অনেকে। আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করলাম জবাব দেওয়ার। দ্রুতই, আমার মনে হচ্ছিলো তারা আমাকে ভুল বুঝছে।

‘আচ্ছা একটা বিষয় পরিষ্কার করি। আমার ভেতরে কোনো মেয়ে আটকা পড়ে নেই। আমি সাধারণ মানুষ,’ আমার এ কথা শুনেই তারা হেসে দিলো। ধীরে ধীরে কমে আসলো তাদের হাসির রোখ।

শেষমেশ সে গুরুজন পলকে কিছু বললো। পল আমার দিকে ফিরে বললো, ‘আপনি যা বলছেন এমন কিছু আমরা দেখিনি, শুনিনি। আমরা বিশ্বাস করি, আপনি পুরুষ হলে আপনি পুরুষই। আপনি নারী হলে নারীই। আমরা তাই মনে করি যা আমরা দেখছি।’

গরম, শুকনো, ধুলোময় গ্রাম, যেখানে সবাই তাদের মুখ থেকে মাছি তাড়াচ্ছিলো, যেখানে সূর্যকে অন্য সব স্থান থেকে কাছে মনে হচ্ছিলো, এমন এক জায়গায় হাঁটার সময় আমি লক্ষ্য করতে বাধ্য হলাম, তারা সবাই অনেক সুখি। আমি ইউরোপ, কানাডা ও আমেরিকার সে সব মানুষের কথা ভাবলাম যারা তাদের জেন্ডার নিয়ে বিভ্রান্তিতে আছে, যাদেরকে তাদের নিজেদের লিঙ্গ এবং তাদের জন্ম নিয়ে বিভ্রান্ত হতে শেখানো হচ্ছে। আমি সেসব নারী ও পুরুষ সম্পর্ক ভাবলাম যারা শুধুমাত্র নিজেদেরকে সুখি করতে দেহকে বিকৃত করছে ভয়ঙ্কর ও কষ্টকর সব পন্থায়। আমি সেসব শিশু সম্পর্কে ভাবলাম যাদেরকে বারবার করে বলা হচ্ছে যদি মানুষ তাদের জেন্ডার পরিচয়কে স্বীকৃতি না দেয় তাহলে তারা আত্মহত্যা করতে চাইবে। আমার মনটা অনেক বেশি কষ্টে ভারি হয়ে উঠলো। এ দুঃখ, হতাশা প্রভাবিত করছে আমার দেশের অনেক মানুষকে।

আমি মাসাই নারীদের সাথে এটা নিয়ে কথা বলতে চাইলাম। আমার সংস্কৃতির ভাষ্যমতে, যদি কেউ অসন্তুষ্ট থাকার, দুঃখে থাকার কোনো কারণ থাকে, তা হলো নারীদের। তাদেরকে পুরুষদের মত চলতে দেওয়া হয় না, তাদেরকে বাচ্চা গর্ভে ধারণ করতে হয়, ঘরে কাজ করতে হয়। এ গ্রামের অনেকেই নারীকে বর্ণনা করেছে ‘পুরুষের সাহায্যকারী হাত’ হিসেবে যেন নারীরা দেহের ঘাড় এবং পুরুষরা মাথা। এ গ্রামের মানুষদের সহায় সম্পদের অভাব ও প্রাকৃতিক কষ্টগুলো যেগুলো নারী-পুরুষ সবাই সহ্য করে তা তো আর না-ই বললাম। আমি নিশ্চিত তাদের কোনো হতাশা থাকবেই।

‘আমি যে সংস্কৃতি থেকে এসেছি, অনেক মানুষ সেখানে হতাশ। আপনাদের কি হতাশা আছে?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।

মেরি নামের এক নারী বললেন, ‘আরে নাহ। কোনো হতাশা নেই। এখানের মানুষরা অনেক সুখি এবং বন্ধুসুলভ।’

আমি আমার আশেপাশে শুধু দারিদ্র্যই দেখছিলাম। ‘আপনাদের কি মনে হয় না যে আপনাদের অনেক জায়গা জমি, গাড়ি বাড়ি লাগবে সুখি হওয়ার জন্য?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।

‘তিনি বলছেন,’ পল বললো, ‘তাদেরকে আরো বেশি খুশি করবে বাচ্চা নেওয়া। দ্বিতীয়ত গরু থাকলেও তারা অনেক খুশি। কারণ গরুর দুধ, তা থেকে বানানো ক্রিম তারা বাচ্চাদেরকে খাওয়াতে পারেন। আবার এক জায়গায় বাগানের মত বসে গল্প করতে পারলেও তারা অনেক খুশি হবে।’

বলতেই হচ্ছে, আমি মাসাই লোকদের মত থাকতে চাইবো না। কোনো আমেরিকানও হয়তো চাইবে না। তাদের জীবন অনেক কঠিন। তাদের দারিদ্র্য অনেক এবং সবসময় তারা এ অবস্থাতেই থাকে। তাদের হয়তো এমন কিছু সাংস্কৃতিক প্র্যাক্টিস থাকবে যা আমি সমর্থন করবো না। সত্য হলো, ইডেনের বাগান বাদে এমন কোনো স্থান বা সোনালি যুগ ছিল না যেখানে সবকিছুই অসাধারণ আর যথার্থ ছিল। তারপরও, মাসাই মানুষরা এমন সত্য আবিষ্কার করেছে যা আমরা পশ্চিমারা জানি না। অথবা তারা কখনো সত্য ভুলে যায়নি, আর আমরা মনে রাখিনি।

সুখ কী? মেরি কী বললো ভাবুন। আপনি যাদেরকে ভালোবাসেন তাদের সাথে কি সময় কাটান? আপনি যাদেরকে ভালোবাসেন তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণের মত কাজ কি আপনি করেন? আপনার কি এমন কেউ আছে যাদেরকে আপনি ভালোবাসেন? জনগোষ্ঠী। মৌলিক রক্ষণাবেক্ষণ। পরিবার ও সন্তান। তারই সবচেয়ে বেশি আছে যার চাহিদা সবচেয়ে কম। সেই সুখি যে তার ভালোবাসার মানুষদের সাথে থাকে। পরিবার ও জনগোষ্ঠীর সাথে।

ডাক্তার থেকে থেরাপিস্ট, রাজনীতিবিদ থেকে প্রফেসর, সানফ্রান্সিসকো থেকে কেনিয়া- আমি প্রায় সবাইকে একটাই প্রশ্ন করে যাচ্ছিলাম। ‘নারী মানে কী?’ এ প্রশ্নটি ছিল লিঙ্গ, জেন্ডার, জীববিজ্ঞান, সামাজিক রোল এবং এ ধরনের বিষয় নিয়ে। কিন্তু এটা আরো বড় একটা প্রশ্ন। সে প্রশ্ন হলো পরিচয়ের। কোথায় আমরা আমাদের পরিচয় খুঁজে পাবো? কী আমাদেরকে সংজ্ঞায়িত করে? পরিচয় কি আমরা প্রকৃতি, সম্প্রদায়, কর্তব্য এবং দায়িত্বের বিশাল এবং সুসজ্জিত কাঠামোর মধ্য থেকে পূরণ করি যা পিতা, মা, পুত্র, কন্যা, বন্ধু, সন্তান বা স্রষ্টার মতো বিষয়গুলোর মধ্যে নিহিত? নাকি পরিচয় এমন কিছু যা আমরা নিজেদের মধ্য থেকে নিজেরাই সংজ্ঞায়িত করি?

হতো সুখ আমরা পুরো দুনিয়াকে আমাদের কল্পরাজ্যের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে বাধ্য করার মধ্যে খুঁজে পাবো না। খুঁজে পাবো আমাদেরকে যা হতে সৃষ্টি করা হয়েছে তাতেই।

 

প্রিয় পাঠক, ট্রান্সজেন্ডারিজমের করাল গ্রাস বইটির ওয়েব ভার্সন উন্মোক্ত করে দেওয়া হয়েছে বইটি প্রকাশের মাত্র দুইদিনের মধ্যেই। একটি বই প্রকাশের পেছনে অসংখ্য মানুষের সময়, শ্রম ও মেধার সমন্বয় থাকে। থাকে বড় একটি ইনভেস্টমেন্ট। বইটির পিডিএফ বা ওয়েব ভার্সনে প্রকাশক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হোন। তাই অনুরোধ, যদি সামর্থ্য থাকে তবে বইটির একটি কপি ক্রয় করবেন। অর্ডার করতে ক্লিক করুন

 

অধ্যায় ১০: বিদ্রোহ <<আগের অধ্যায়                                              পরের অধ্যায়>>কিন্তু

Book: ট্রান্সজেন্ডারিজমের করাল গ্রাস Tags:

This entry was posted in . Bookmark the permalink.