ট্রান্সজেন্ডারিজমের করাল গ্রাস: অধ্যায় ৩

ট্রান্সজেন্ডারিজমের করাল গ্রাস: অধ্যায় ৩

 

সূচিপত্র

ভূমিকা
অধ্যায় ১: একটি সহজ প্রশ্ন
অধ্যায় ২: জেন্ডার থিওরির ইতিহাস
অধ্যায় ৩: জন মানি
অধ্যায় ৪: কীভাবে কারিকুলামে জেন্ডার থিওরি ঢুকে গেলো
অধ্যায় ৫: ট্রান্সজেন্ডাররা যেভাবে সব দখল করে নিলো
অধ্যায় ৬: ট্রানজিশনের প্রতিশ্রুতি
অধ্যায় ৭: তাসের ঘরের পতন
অধ্যায় ৮: ট্রান্সজেন্ডার সাংস্কৃতিক সংঘাত
অধ্যায় ৯: গোলাপি পুলিশ স্টেটের বুটের চাপায় ধ্বংস
অধ্যায় ১০: বিদ্রোহ
উপসংহার: আফ্রিকা
কিন্তু
রেফারেন্স

 

অধ্যায়: ৩

জন মানি

জন মানির আগে, লিঙ্গতত্ত্ব ও ট্রান্সজেন্ডারিজমের পক্ষে খুব বেশি মানুষ ছিল না। ছিল কেবল ম্যাগনাস হার্শফেল্ড ও আলফ্রেড কিনসির মতো লোকেরা। কিন্তু তখনও এটি বর্তমানের লিঙ্গতত্ত্বের আকার ধারণ করেনি, যেভাবে আমরা আজ এটিকে দেখছি৷ জন মানি সেই ব্যক্তি যিনি পাজলের টুকরোগুলোকে একত্রিত করেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে, তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি ‘জেন্ডার’ শব্দটিকে লিঙ্গ থেকে আলাদা করেন।

কিন্তু আমি যখন সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলাম তখন খুব কম লোকই তাঁর কথা বলেছে। তারা কি তাঁকে নিয়ে কথা বলতে চায়নি? তারা কি তাঁর সম্পর্কে জানত না? আমি আরও উত্তরের জন্য মরিয়া ছিলাম। তাই আরও গভীরে ঢুকে পড়ি।

আমি যেখানে ছেড়ে দিয়েছিলাম সেখান থেকেই শুরু করার সিদ্ধান্ত নিই।

মানিকে অনুসরণ

মনে হচ্ছিল জন মানির সাথে আলফ্রেড কিনসির বেশ কয়েকটি লিঙ্ক ছিল। কিনসির ‘ইন্সটিটিউট ফর সেক্স রিসার্চ’ (কিনসি মারা যাওয়ার পর নাম পরিবর্তন করে কিনসি ইনস্টিটিউট ফর সেক্স রিসার্চ করা হয়)-এ মানিকে মূল গবেষকদের একজন বিবেচনা করা হতো। মানি আসলে জুন রিনিশের একজন মেন্টর ছিলেন। জুন রিনিশ হচ্ছেন কিনসির মৃত্যুর পর কিনসি ইনস্টিটিউটের দ্বিতীয় পরিচালক। জন মানির পাণ্ডুলিপি, নিবন্ধ, মিডিয়া ইন্টারভিউ, বক্তৃতা, চিঠিপত্র এবং আরও অনেক কিছু সবই কিনসি ইনস্টিটিউট লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত আছে।

হ্যারি বেঞ্জামিনের সাথেও জন মানির সংযোগ ছিল। হার্শফেল্ড ও কিনসির মধ্যে যোগসূত্র হিসেবে যারা কাজ করেছিলেন, হ্যারি তাদের একজন। মানি ১৯৬৪ থেকে ১৯৬৭ পর্যন্ত ট্রান্সসেক্সুয়ালিজমের ওপর হ্যারি বেঞ্জামিনের গবেষণা দলের অংশ ছিলেন। তিনি রোগীর রেফারেন্স পাওয়ার জন্য হ্যারি বেঞ্জামিন ফাউন্ডেশনের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেন।

জন মানি ও আলফ্রেড কিনসি একে অপরকে চিনতেন। তাঁরা উভয়ই জেন্ডার ও লিঙ্গ নিয়ে গবেষণা করছিলেন। কিন্তু আলফ্রেড কিনসি এই বিষয়গুলো সম্পর্কে যেভাবে কথা বলতেন তা জন মানির সর্বদা মনঃপুত হতো না। তিনি ভাবতেন এসব মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তুলছে। তবুও তাঁরা উভয়ই একটি ছোট দলের অংশ ছিলেন যারা ২০ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এই বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছিলেন।

আমি জন মানির বিষয়টি ড. ফোর্সিয়ারের কাছে তুলে ধরলে তখন তিনি একটা আত্মরক্ষামূলক ভঙ্গি করেন এবং বিষয়টি উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি আমাকে বলেন, ‘[জন মানি] হলেন এমন ব্যক্তি যিনি জেন্ডার নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের মধ্যে প্রথম। এর পাশাপাশি আমরা জেন্ডারের ব্যাপারে জেনেছি হিজড়া সম্প্রদায় থেকে।’ তিনি আরও বলেন, ড. মানি হলেন এমন ব্যক্তি ‘যার অরিজিনাল চিন্তা আছে,’ তিনি ‘সত্যিকার অর্থে অগ্রগামী,’ এবং যিনি ‘ব্যক্তির অধিকারের প্রতি সচেষ্ট’ ছিলেন। এর মানে কি তিনি কিনসির মতো বিকৃত মনোরোগী ছিলেন না? আসুন মানির গল্পের ভেতরে ঢুকি এবং ‘জেন্ডারতত্ত্বের জনক’ হওয়ার জন্য তিনি কী করেছিলেন তা খুঁজে বের করি।

জন মানি ৮ জুলাই, ১৯২১ সালে নিউজিল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন। কিছু লোক মনে করেন যে, তাঁর শৈশবকাল ছিল অত্যন্ত কঠিন। কারণ তাঁর বাবা ছিলেন হিংস্র প্রকৃতির, প্রচণ্ড মদ্যপান করতেন তিনি। এটা জন ও তারঁ মাকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন যে, শিশুকালের এই বিরূপ অভিজ্ঞতার কারণে জন তাঁর নিজের লিঙ্গ নিয়ে অস্বস্তি বোধ করতেন (gender dysphoria) ফলে তিনি এটি অধ্যয়নে আগ্রহী হন।

ড. গ্রসম্যান ব্যাখ্যা করেন, ‘তাঁর প্রথম পুরুষালি রোল মডেল ছিল একটি দানব অর্থাৎ তাঁর পিতা। মানি তাঁর পরিবারের নারী সদস্য এবং তাঁর নারী আত্মীয়স্বজনদের সাথে অনেক বেশি আড্ডা দিতেন, কারণ এই লোকটি অর্থাৎ তাঁর বাবা সবাইকে আতঙ্কগ্রস্ত করে রেখেছিল।’

মানি নিজে বলেন, ‘আমি পুরুষ হওয়ার অপরাধে ভুগছি। আমি পুরুষের জঘন্য যৌনতার চিহ্ন বহন করছি।’১০ মানি ১৯৫০-এর শেষের দিকে জীবনে একবারই বিয়ে করেছিলেন, আর সেটা শীঘ্রই ডিভোর্সে গড়ায়।১১

ড. গ্রসম্যান মনে করেন, জন মানি ও আলফ্রেড কিনসি উভয়েরই বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে কঠিন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়। জেন্ডার ও লিঙ্গের ওপর কাজ করে তাঁরা বিষয়গুলো বুঝতে চেয়েছিলেন। এটিই ছিল তাঁদের নিজেদের ভালো লাগানোর উপায়। বোঝার বিষয়ে তাঁদের কাজ ছিল তাঁদের ভালো বোধ করার একটি উপায়। তাঁরা তাঁদের আইডিয়াগুলো ব্যবহার করে নিজস্ব সংগ্রামের পেছনের অর্থ খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন, যেন তাঁরা এই সংগ্রাম থেকে কিছুটা স্বস্তি লাভ করতে পারেন।

ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি, ওয়েলিংটন থেকে তিনি স্নাতক হন। এসময় তাঁর ছিল একটি শিক্ষকের সার্টিফিকেশন এবং দুটি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি। একটি ডিগ্রি ছিল শিক্ষায় এবং অপর দুটি মাস্টার্স ডিগ্রি ছিল দর্শন ও মনোবিজ্ঞানে। মানি ডুনেডিনের ওটাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগে কয়েক বছর কাজ করেন।১২ তবে এখানে তাঁর কাজের পরিধিকাল ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত। কারণ ১৯৪৭ সালের দিকে মানি যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। সেখানে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি পিএইচডি প্রোগ্রামে প্রবেশ করেন।১৩ সেখানে তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ‘Hermaphroditism: An Inquiry into the Nature of a Human Paradox’।১৪

লক্ষ্য ছিল ইন্টারসেক্স অর্থাৎ হিজড়াদের নিয়ে গবেষণা করা। ড. গ্রসম্যান ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘এটি এমন এক অবস্থা যা কারো মধ্যে থাকলে তার ভেতর পুরুষ ও নারী উভয়েরই যৌনাঙ্গ বা সেগুলোর অংশবিশেষ থাকে। একে হারমাফ্রোডিটিজম বলা হতো; এখন একে বলা হয় ইন্টারসেক্স।’ এটি গবেষণা করা বৈধ বিষয় ছিল কারণ কিছু শিশু আসলেও এই অবস্থা নিয়ে জন্মায়। তবুও ডা. গ্রসম্যানের মতে, এটি অত্যন্ত ছোট সংখ্যা। অর্থাৎ খুব কম মানুষই ইন্টারসেক্স হয়ে জন্মায়। তাদের সংখ্যা হয় দশ হাজারে একটিতে। প্রতি দশ হাজার জনে ইন্টারসেক্স শিশু জন্মায় একজন। সেই ক্ষুদ্র জনসংখ্যার অস্তিত্ব থেকেই মানি অত্যন্ত শক্তিশালী এক হাইপোথিসিস দিয়ে বসেন।

ড. গ্রসম্যান আমাকে বলেন, ‘জন মানি একটি থিওরি নিয়ে এসেছিলেন যে, আমাদের প্রত্যেকেই হারমাফ্রোডাইট বা হিজড়া হয়ে জন্মগ্রহণ করে, শারীরিকভাবে না হলেও অন্তত মানসিকভাবে।’ অর্থাৎ প্রাকৃতিক লিঙ্গ বলতে কিছু নেই। মানুষ বড় হয়ে পুরুষ না নারী হবে সেটা নির্ভর করে লালন-পালনের ওপর। এটা জেন্ডার রোলের আধুনিক তত্ত্বের সাথে ভালোমতো খাপ খায়। এ ছাড়া বলা হয়ে থাকে, পৌরুষত্ব ও নারীত্বের মতো ধারণাগুলো সমাজের সৃষ্টি। লালন-পালনই একমাত্র দিক যার ওপর নির্ভর করবে কেউ পুরুষ হিসেবে নিজেকে ভাববে না নারী। কিন্তু লালন-পালনই যদি সব হয়, তাহলে এমন কোনো জীবগত কারণ নেই যার কারণে মেয়েরা পুতুল নিয়ে আর ছেলেরা ট্রাক নিয়ে খেলতে চাইবে। অর্থাৎ, কোনো মেয়েকেও যদি ছেলের মতো করে লালন-পালন করা হয়, সে ট্রাক নিয়েই খেলবে।

ড. গ্রসম্যান ধারণা করার চেষ্টা করেছিলেন কেন জন মানি একটি নির্দিষ্ট ধারণার প্রতি এত আগ্রহী। মানি বিশ্বাস করতেন যে, প্রত্যেকেই হারমাফ্রোডাইট হিসেবে জন্মগ্রহণ করে, যার অর্থ তারা ছেলে বা মেয়ে হতে পারে। শারীরিকভাবে না হলেও মানসিকভাবে যে কেউ যে কোনোটাই হতে পারে। কিন্তু কোনটা হবে তা নির্ভর করবে তার লালন-পালনের ওপর। জন মানি এই তত্ত্বটি নিয়ে এসেছিলেন কারণ এটি ছিল তাঁর কষ্ট ও যন্ত্রণার উত্তর। কারণ তিনি তাঁর পিতার লিঙ্গে নিজেকে ফেলতে চাইছেন না।

যাহোক, ড. গ্রসম্যান জন মানির ধারণার সাথে একমত নন। তিনি বলেন, জন যখন প্রথম এই থিওরিটি [যে ছেলে বা মেয়ে হওয়া প্রকৃতি নয় বরং লালন-পালনের ওপর নির্ভর করে] নিয়ে এসেছিলেন তখন এটি কিছুটা সত্য বলে মনে হয়েছিল। কারণ এখন যেভাবে X আর Y ক্রোমোসোম দেখা যায়, তখন সেভাবে দেখা যেত না।

উল্লেখ্য, মানির তত্ত্ব বিজ্ঞান, মেডিসিন ও সমাজে ব্যাপক প্রভাব রাখলেও মানি নিজে মনোবিজ্ঞানী ছিলেন না। তিনি কোনো মেডিকেল ডাক্তার, সার্জন বা এমনকি জীববিজ্ঞানীও ছিলেন না।১৫ তার থিওরি বায়োলজি থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। কারণ তিনি শুধু আচরণগত দিকের ওপর ফোকাস করেছিলেন।

জন মানিসহ আরো দুজন লোক জোয়ান ও জন হ্যাম্পসন সম্পর্কে জোয়ান মেইরোভিটজ লিখেছেন, এরা বিশ্বাস করতেন একজন ব্যক্তি ছেলে না মেয়ের মতো অনুভব করবে তা তাদের দেহের শারীরিক অংশ যেমন হরমোন, যৌনাঙ্গ বা ক্রোমোজোম দ্বারা নির্ধারিত হয় না। তাদের মতে, এটি নির্ভর করে শিশুকালে তাদেরকে কোন লিঙ্গের কথা বলা হয়েছে এবং কোন লিঙ্গের ওপর তাদেরকে বড় করা হয়েছে। জন মানি আরও বিশ্বাস করতেন, ব্যক্তি তার লিঙ্গ সম্পর্কে কেমন অনুভব করবে, তা হরমোনের মতো জিনিসগুলোর ওপর নয় বরং এটি তাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে।১৬

নিউইয়র্ক টাইমস ১৯৭৩ সালে মানির ‘গবেষণা’ নিয়ে আলোচনার সময় লিখেছিল, ‘যদি আপনি একটি ছেলেকে বলেন যে, সে একটি মেয়ে, এবং তাকে নারী হিসেবে বড় করেন, তাহলে সে মেয়েলি জিনিসগুলোই করতে চাইবে।’১৭

জন মানি ও তাঁর দল মনে করেছিলেন, ব্যক্তির জেন্ডার তাদের সেক্স থেকে আলাদা। তাই তাঁরা ‘জেন্ডার’ (মানসিকভাবে তারা নিজেদের কোন লিঙ্গের মনে করে) শব্দটি দ্বারা ব্যক্তির মনস্তাত্ত্বিক লিঙ্গ বোঝাতেন এবং ‘সেক্স’ (শারীরিকভাবে তারা কোন লিঙ্গের। পুরুষের লিঙ্গ থাকলে পুরুষ, নারীর লিঙ্গ থাকলে নারী) দ্বারা জৈবিক লিঙ্গ বোঝাতেন। মানি ছয়টি ভিন্ন ফ্যাক্টরের দ্বারা লিঙ্গকে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন: নির্ধারিত লিঙ্গ, বাহ্যিক যৌনাঙ্গ, অভ্যন্তরীণ প্রজনন কাঠামো, হরমোনাল এবং সেকেন্ডারি লিঙ্গের বৈশিষ্ট্য, গোনাডাল লিঙ্গ এবং ক্রোমোজোমাল লিঙ্গ।১৮ তাঁর পার্থক্যগুলো আজও ব্যবহার করা হয় এবং এর সম্প্রসারণ ঘটে।

ক্যালিফোর্নিয়ার লিঙ্গপরিবর্তনের সার্জন ডা. মার্সি বোয়ার্সের ইন্টারভিউ নিয়েছি আমি। তিনি যেন তার প্রতিটি কথায় মানির ভাষার প্রতিফলন ঘটাচ্ছিলেন। তিনি আমাকে বলেছেন, ‘সেক্সের অন্তত এক ডজন ভিন্ন জৈবিক পরিমাপ আছে। ক্রোমোজোমাল সেক্স আছে, হরমোনাল সেক্স আছে, শারীরবৃত্তীয় যৌনতা আছে।’

জন মানি ও বোয়ার্সের সিস্টেম অনুসারে, বায়োলজিক্যাল সেক্সের এই ক্যাটাগরিগুলো জেন্ডার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। ১৯৫৫ সালে মানি ‘জেন্ডার রোল’ পরিভাষা দ্বারা এমন সব কথা বা কাজকে বুঝিয়েছেন যা একজন ব্যক্তি করে নিজেকে ছেলে বা মেয়ে হিসেবে প্রকাশ করার জন্য। আর ‘জেন্ডার’ দ্বারা বাহ্যিক অবস্থা, দৃষ্টিভঙ্গি, ওরিয়েন্টেশন বুঝিয়ছিলেন।১৯ অর্থাৎ, সেক্স বা যৌনতা ছিল শুধুই বায়োলজির বিষয়। আর এর বাইরের সবকিছুই জেন্ডার। এই দুটোর মেলার দরকার ছিল না।

‘জেন্ডার’ কোনো বানানো শব্দ নয়। এটি আগেও ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হতো কেউ ছেলে না মেয়ে তা বোঝানোর জন্য। ‘জেন্ডার’ শব্দটির মূলশব্দ হচ্ছে ‘gene,’ ‘genus,’ এবং ‘genre’ যার সবগুলোই হচ্ছে মানুষ, প্রাণী বা বস্তুকে শ্রেণীবিন্যাস করার উপায়।২০ তাহলে কীভাবে বর্তমানে এই ভাষাগত ও গাঠনিক শব্দটি প্রায় সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ গ্রহণ করেছে? এটি আজকাল অন্তত ব্যবহার করা হচ্ছে নারী-পুরুষের মধ্যকার বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত পার্থক্যকে অস্বীকার করতে। এটি আমাদের অনেক কিছু বোঝার ক্ষমতাকে নষ্ট করে দিয়েছে। এর মধ্যে ‘নারী’ শব্দের সংজ্ঞাও আছে।

এই ব্যাখ্যা জন মানিই করুক। ‘যেহেতু লৈঙ্গিক পার্থক্য কেবল যৌনাঙ্গের ওপর নির্ভর করে না, তাই এগুলোকে শ্রেণীকরণ করার জন্য একটি শব্দের দরকার ছিল। এই শব্দটি এখন ভাষাতেও ঢুকে গেছে। শব্দটি হচ্ছে জেন্ডার।’২১ আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, মানুষ জেন্ডার শব্দটিকে দিয়ে শৃঙ্খলা বোঝায়। কিন্তু মানি এই শব্দটি দিয়েই বিশৃঙ্খলা ও সংশয় সৃষ্টি করেছেন। এভাবেই জেন্ডার থিওরির প্রবক্তারা ভাষার অপব্যাখ্যা করেন।

ড. গ্রসম্যান মানির থিওরি নিয়ে আরো বলেন, ‘মানি সারাজীবন একটি আইডিয়া নিয়ে কাজ করেছেন এবং সেটাই বিশ্বের কাছে প্রচার করেছেন যে, যখন একটি শিশু জন্মায় তখন তার কোনো লিঙ্গ থাকে না। শিশুটি লিঙ্গনিরপেক্ষ হয়। সে পুরুষ বা নারী কোনোটাই হয় না। পুরুষ বা নারীতে রূপান্তরিত হওয়া শুরু হয় জীবনের প্রথম বছরে। এটা নির্ভর করে শিশুটি পিতামাতা, স্কুল ও সমাজের কাছ থেকে কি রকম মেসেজ পাচ্ছে তার ওপর।’ এই অনুকল্প অনুসারে, একজনের নারী বা পুরুষ হওয়াটা শারীরিক গঠন বা মনস্তত্ত্ব নয়, বরং বেড়ে ওঠার ওপর পুরোপুরি নির্ভর করে।

কিন্তু এটাই যদি বিষয় হয়, তাহলে কেউ পুরুষালি বা মেয়েলি স্বভাবের হওয়ার অর্থ কি? মানি জেন্ডারের মতোই পুরুষালি স্বভাব বা মেয়েলি স্বভাবকে বাস্তবতা বা দৈহিক গঠন থেকে বিচ্ছিন্ন করেন। ড. ফোর্সিয়ারের মতে, নারী-পুরুষের এই ভূমিকাগুলো ছিল মোটামুটি সবই ‘সমাজের সৃষ্টি’। তবে কেবল তিনিই এ ধরনের কথা বলেননি। ড. বাওয়ার্সও স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘জেন্ডার ও লিঙ্গপরিচয় উভয়ই সমাজের সৃষ্টি। আপনি একে যা দেবেন তা-ই সে গ্রহণ করবে।’

ড. বাওয়ার্স আরও বলেন, লিঙ্গপরিবর্তন বা সার্জারি কখনই একজনকে নারী বা পুরুষ বানায় না। কারণ লিঙ্গপরিবর্তন করা অসম্ভব বলে নয়, বরং লিঙ্গ হচ্ছে সমাজের সৃষ্টি। জেন্ডার থিওরির প্রবক্তারা সবাই একই স্ক্রিপ্ট দেখে কথা বলছিল। আর এই স্ক্রিপ্টের লেখক জন মানি।

মেয়ারোভিটজ জন মানির থিওরি ও কিনসির থিওরির মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক দেখান: ‘আলফ্রেড কিনসি ও তাঁর সহকর্মীরা মানব উভকামিতার তত্ত্ব এবং প্রাথমিক ব্যক্তিত্ব বিকাশের মনোবিশ্লেষণিক তত্ত্ব উভয়কেই প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁদের মতে, মানুষের অধিকাংশ যৌনআচরণ আসে শিখন ও কন্ডিশনিংয়ের মাধ্যমে। একইভাবে, ইন্টারসেক্স কন্ডিশনের বিষয়ে গবেষণায় মানি, হ্যাম্পসন এবং হ্যাম্পসন জেন্ডারের উৎস হিসেবে সামাজিক শিক্ষা ভূমিকা রাখে বলে উল্লেখ করেছেন।’২২ মানি মূলত কাজ করছিলেন আলফ্রেড কিনসির কাজের ওপর।

জন মানি মনে করতেন, ছোটবেলা থেকেই শিশুদের লিঙ্গ অনুসারে আচরণ করতে শেখানো গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বিশ্বাস করতেন, বাবা-মায়ের তাদের সন্তানদের দেখানো উচিত যে ছেলে এবং মেয়েদের কেমন আচরণ করা উচিত। তিনি এই ধারণায় বিশ্বাস করেননি যে জেন্ডার এবং লিঙ্গকে আলাদা করা যেতে পারে। অথবা সমাজে পৌরুষত্ব বা নারীত্ব নিয়ে যে ধারণা প্রচলিত সেটার বিরুদ্ধে যাওয়া উচিত নয়।২৩

কিছু মানুষ এখন বিশ্বাস করেন, নারী-পুরুষের ভূমিকা জন্মগতভাবে নির্ধারিত নয় বরং এটি পরিবর্তিত হতে পারে। তারা এটাও বিশ্বাস করেন, বাচ্চাদের তাদের নিজের লিঙ্গ বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দেওয়া উচিত। তারা ছেলে নাকি মেয়ে এটা সমাজের ঠিক করে দেওয়া অনুচিত। এই ধারণাটি এসেছে জন মানির কাছ থেকে। তিনি মনে করতেন, জেন্ডার রোল সুনির্ধারিত কিছু নয়। শিশুদের এমনভাবে বড় করা উচিত যেন তারা নিজেদের লিঙ্গ নিজেরাই বেছে নিতে পারে।

মানির তত্ত্ব কীভাবে কাজ করেছে সেটা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ড. গ্রসম্যান আমাকে বলেন, ‘জেন্ডার’ একটি উপলব্ধি। এটা একটা অনুভূতি।’

‘এটি নিজেকে শনাক্তকরণের একটি উপায়। এটা একটা অভিজ্ঞতা। এটা বিষয়ভিত্তিক। এটা ব্যক্তির উপর নির্ভর করে। এটি সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হতে পারে।’

মানির অনুমিত অনুসন্ধান সমাজে এত ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল যে সাংবাদিক ও লেখক জেমস লিঙ্কন কলিয়ার নিউইয়র্ক টাইমস-এ লিখেছেন, জন মানির গবেষণা ‘কিনসি রিপোর্টের পর প্রদর্শিত সমাজবিজ্ঞানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।’২৪

মানির থিওরি আস্তে আস্তে বিবর্তিত হতে থাকে। যেমন, প্রথমে দাবি করা হচ্ছিল যে শিশু পুরুষালি আচরণ করবে নাকি মেয়েলি তা নির্ভর করে তাকে কীভাবে বড় করা হয়েছে তার ওপর। তারপর তিনি এই আইডিয়া দেন যে, যে জন্মপূর্ব (prenatal) হরমোনগুলোও আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে।২৫ এর দ্বারা হরমোন থেরাপির ওপর আধুনিক গবেষণার দুয়ার খুলে যায়। তবে তার মূল ধারণাটা ঠিকই থাকে যে, জেন্ডার আর লিঙ্গ ভিন্ন জিনিস। জেন্ডার অনেক নমনীয় একটা জিনিস। মানুষ যেটা কল্পনাও করতে পারবে না।

মানির রাজনৈতিক (এবং যৌন) এজেন্ডা

অনেক জনপ্রিয় বিজ্ঞানীর মতো মানিও গবেষণা, তথ্য ও ফ্যাক্ট নিয়ে তেমন সচেতন ছিলেন না। হার্শফেল্ড এবং কিনসির মতো মানিরও একটি রাজনৈতিক এজেন্ডা ছিল। মেয়ারোভিটজ লিখেছেন, ‘জন মানি বিশ্বাস করতেন, যৌনতার ব্যাপারে চিরাচরিত চিন্তাভাবনাকে পরিত্যাগ করা এবং যৌনস্বাধীনতাকে প্রচারের ক্ষেত্রে নিজেকে নেতৃস্থানীয় পর্যায়ের ভাবতেন। কিছু মানুষ তাকে মেধাবী ও ক্যারিশম্যাটিক হিসেবে দেখত, আবার অন্যরা একটা নির্দিষ্ট মাত্রায় তাকে অপছন্দ করত। তার নিজের ওপর এতটা আত্মবিশ্বাস ও কনফিডেন্স কাজ করত যে এটা তাকে অহংকারের দিকে ধাবিত করে।’২৬

এটা কোনো বিজ্ঞানীর ধাঁচ হতে পারে না। অবশ্যই, সমাজে নারী ও পুরুষ কীভাবে আচরণ করবে তা কিছুটা হলেও নির্ভর করে বেড়ে ওঠার ওপর। কিন্তু কীভাবে একজন যুক্তিসম্পন্ন মানুষ দাবি করতে পারে যে, নারী হওয়ার ব্যাপারে অন্তর্জাত কোনো বিষয় নেই? সবই সমাজের ওপর নির্ভরশীল?

মানুষ লক্ষ্য করতে শুরু করে যে জন মানি খুব অহংকারী এবং তাঁর নিজের ধারণাগুলোর ব্যাপারে অনেক আত্মপ্রত্যয়ী। তিনি যেভাবে শব্দ ব্যবহার করেছেন তা দেখেই বিষয়টি তারা খেয়াল করে। যদিও তিনি বলতেন যে, তিনি লেখক আর্নেস্ট হেমিংওয়ের মতো সহজ লেখা পছন্দ করেন।২৭ অথচ তিনি যা বলতে চান সেটা করার জন্য নতুন নতুন শব্দ বানাতেন এবং পুরো শব্দের অর্থ পালটে দিতেন। এটা শুধু ‘জেন্ডার’ শব্দের ক্ষেত্রে নয়, বরং আরো অনেক শব্দের ক্ষেত্রে।

তিনি ‘সেক্সুয়াল প্রেফারেন্স’ বা যৌনপছন্দ শব্দটিকে পরিবর্তন করেন। শব্দটি দ্বারা বোঝাত, কে কাদের সাথে মিলন করতে পছন্দ করে। এটিকে বদলে ফেলেন ‘সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশন’-এ। যার অর্থ, মানুষের নির্দিষ্ট যৌনপছন্দ নেই। মানুষকে জন্মের পর থেকে পুরুষ বা স্ত্রী যে কোনো একটি নির্দিষ্ট দিকে ধাবিত করা হয়।

মানির অন্য পরিভাষাগুলো জনপ্রিয় অভিধানে স্থান না পেলেও তিনি কীভাবে চিন্তা করতেন তা জানা যায়। যেমন, তিনি ‘perversion’ (নোংরামি)-কে পরিবর্তন করার চেষ্টা করেন ‘paraphilia’-য় (অস্বাভাবিক যৌনকামনা)।২৮ এখানে মূল আইডিয়া ছিল, মানুষ যেসব জিনিসকে স্বাভাবিক যৌনতা বলে মনে করে না বরং নোংরামি ভাবে (যেমন, স্যাডোম্যাসোকিজম) সেগুলো আসলে নোংরামি এমনকি অস্বাভাবিকও না। এগুলো হচ্ছে ‘ভালোবাসার’ এমন বহিঃপ্রকাশ যেগুলো সমাজে সম্মানজনক বলে বিবেচনা করা হয় না। যদিও মানির পরিভাষা কখনই প্রচলিত হয়নি, কিন্তু এর পেছনের আইডিয়াগুলো থেকে জন মানির চিন্তাচেতনার ব্যাপারে ধারণা পাওয়া যায়।

জন মানি The Adam Principle গ্রন্থটি লিখেছিলেন যেখানে তিনি বলেছিলেন, দুই ধরনের (‘pedophilic sadism’২৯ এবং ‘affectional pedophilia’৩০) প্রাপ্তবয়স্ক ছিল যারা বাচ্চাদের সাথে যৌনসম্পর্ক করে। তিনি বলেছিলেন, এক ধরনের লোক শিশুদের জন্য খুব খারাপ ও ক্ষতিকারক ছিল। অপরদিকে অন্য প্রকারের লোক সদয় ছিল এবং শিশুরা তাদের পছন্দ করে। এটি অত্যন্ত জঘন্য বিষয়। কারণ এটি পড়ে মনে হতে পারে যে, বড়দের বাচ্চাদের সাথে যৌনসম্পর্ক করা সঠিক কাজ।

মানি শিশুকাম নিয়ে বইটিতে আরো আলাপ করেন, তবে একবারও এর বিরুদ্ধে কিছু বলেননি। তাঁর মতে, যতক্ষণ না এতে সহিংসতা জড়িয়ে পড়ছে ততক্ষণ শিশুকাম খারাপ কাজ না। বরঞ্চ, তিনি শিশুকাম নিয়ে ইতিবাচকভাবে লেখেন। তিনি বলেন, শিশুকামী ও শিশুরা যৌনমিলনের পর একটি চিরস্থায়ী সুখি অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারে।

মানি লিখেছেন, যখন একজন শিশুকামী লোক একটি শিশুর সাথে যৌনসম্পর্কে লিপ্ত থাকে এবং শিশুটির বয়স ধীরে ধীরে বেড়ে যাওয়ার কারণে সে আর শিশুকামী লোকটির কাছে আকর্ষণীয় থাকে না, এরপর তারা মিলন না করলেও বন্ধু থাকতে পারে।৩১

এটা বলার মতো শোভনীয় কোনো বিষয় না, কারণ শিশুকামীটা শিশুটির সাথে যে জঘন্য কাজ করেছে এরপর তাদের মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক কোনোভাবেই গড়ে উঠতে পারে না।

জন মানি এমন কিছু মন্তব্য করেছেন যা বাচ্চাদের সাথে খারাপ কাজ করতে চায় এমন শিশুকামীদের পক্ষে যায়। মানি নিন্দা করেছিলেন যে, ‘কীভাবে কংগ্রেস শৈশবের আইনি বয়সসীমা বাড়িয়েছে (পাবলিক আইন ৯৮-২৯২, ১৯৮৪ সালের শিশু সুরক্ষা আইন) যেন শিশুকামীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হয় এবং তাদের বিচার করা যায়।’৩২ বিষয়টা বুঝতে পেরেছেন? মানি ভেবেছিলেন যে এই আইনটা বাচ্চাদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য করা হয়নি, করা হয়েছে শিশুকামীদের ধরার জন্য।

আমি ভেবেছিলাম এর চেয়ে জঘন্য কিছু আর দেখতে হবে না। কিন্তু আমি দেখলাম যে মানি কেবল বিভিন্ন ধরনের শিশুকামের ভেতর পার্থক্য করার চেষ্টাই করছিলেন না, বরং এক ধরনের শিশুকামকে অপর ধরনের শিশুকামের চেয়ে অধিক গ্রহণযোগ্য বলার চেষ্টা করছিলেন। তরুণ যুবক-যুবতীরা যে বয়স্ক পুরুষ বা নারীদের সাথে কোনো নেতিবাচক প্রভাব ছাড়াই যৌনসম্পর্ক জড়াতে পারে এই ধারণাটিকে তিনি লুকানোর চেষ্টাও করেননি। এক পর্যায়ে তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে, তিনি নাবালক-নাবালিকাদের যৌন নির্যাতনকে সমর্থন করেন। মানি বলেন, ‘যদি আমি কোনো ১০ বা ১১ বছর বয়সী বালককে দেখি সে ২০ বা ৩০ বছর বয়সী কোনো পুরুষের প্রতি অতি কামুকভাবে আকৃষ্ট, তাদের সম্পর্ক যদি পরস্পরের সম্মতির ভিত্তিতে হয়, তাদের বন্ধনও যদি সম্মতিপূর্ণ হয়ে থাকে, তাহলে সেটাকে কোনোভাবেই ভুল বা ক্ষতিকর বলা যায় না।’৩৩ ১০-১১ বছরের শিশুর জন্য ৩৫ বছর বয়সী পুরুষের সাথে সম্মতিপূর্ণ বন্ধন গড়া অসম্ভব। এই বয়সের শিশুরা শারীরিক ও মানসিকভাবে এই কাজের জন্য অসমর্থ। আর এই বয়সে বয়স্ক পুরুষদের কামবাসনার পাত্র হওয়া অনুচিত।

সমকামীদের প্রতি মানির সমর্থন শুধুমাত্র যৌনতার প্রতি প্রথাগত দৃষ্টিভঙ্গিকে চ্যালেঞ্জ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তিনি সব নৈতিক সীমাবদ্ধতাকে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করতে চান। মানির ধারণাগুলো আমাদের সমাজের সবচেয়ে দুর্বল শ্রেণী অর্থাৎ শিশুদের অন্যদের বিকৃত কামনার পাত্র সদস্যদের, আমাদের সন্তানদের, অন্যের বিকৃত ইচ্ছার শিকার হতে হবে, যা সম্পূর্ণরূপে অগ্রহণযোগ্য। তদুপরি, একজন সম্মানিত সেক্সোলজিস্ট হিসেবে মানির মর্যাদা তাঁর মতামতকে কর্তৃত্বের একটি বাতাস দেয়, যা উদ্বেগজনক কারণ এটি অন্যদেরকে এই ধরনের আচরণ গ্রহণযোগ্য বলে মনে করতে উৎসাহিত করতে পারে।

যৌনতার ক্ষেত্রে কোনো নিয়ম বা সীমা না থাকার ধারণাটি ট্রান্সজেন্ডার আন্দোলনের বিরুদ্ধে যায় বা যৌনবিপ্লবের বিরুদ্ধে যায় এমন কিছু নয়। প্রকৃতপক্ষে, মনে করা হয় যে আপনি যে ধরনের যৌনতা চান তা করার জন্য সীমাহীন স্বাধীনতা থাকা যৌনমুক্তি আন্দোলনের একটি মৌলিক অংশ। ট্রান্সজেন্ডারিজম এই বৃহত্তর আন্দোলনের একটি অংশ মাত্র।

হঠাৎ, আমার মন আলফ্রেড কিনসির দিকে ফিরে গেল। কে কিনসির মুখোশ খুলে দিয়েছিল? হ্যাঁ, তিনি হচ্ছেন জুডিথ রিসম্যান। আমি তাঁর গবেষণাগুলো বের করে ইন্টারেস্টিং কিছু বিষয় খুঁজে পেয়েছি। ১৯৮১ সালে জেরুজালেমে যৌনবিদ্যার পঞ্চম বিশ্ব কংগ্রেসে রেইসম্যান কীভাবে তাঁর ফলাফলগুলো উপস্থাপন করেছিলেন সে সম্পর্কে একটি গল্প ছিল।৩৪ তিনি লিখেছেন, সেই সম্মেলনে তিনি একটি গবেষণাপত্রের প্রেজেন্টেশন দিয়েছিলেন যার শিরোনাম ছিল ‘The Scientist as Contributing Agent to Child Sexual Abuse: A Preliminary Consideration of Possible Ethics Violation।’

ইভেন্ট চলাকালে রেইসম্যান শিশুদের ওপর কিনসির এক্সপেরিমেন্টের বিষয়ে কথা বলেছেন। কিনসি ‘প্রাক-কৈশোরিক অর্গাজম’ বলে একটি পরিভাষা সৃষ্টি করেছেন। এ সম্পর্কে কিছু ভয়ানক তথ্য শেয়ার করেন রেইসম্যান। তিনি কিনসির বই থেকেই স্লাইড বানিয়ে দর্শকদের সামনে উপস্থাপন করেছিলেন। তাঁর উপস্থাপনা শেষ হওয়ার পর ঘরের সবার চেহারা স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।

তখনই এক সুইডিশ রিপোর্টার ঝাঁপিয়ে পড়েন। রেইসম্যানের মতে, তিনি ‘উপস্থিত ব্যক্তিদের চিন্তামগ্নতা কাটিয়ে তোলেন। তিনি ইংল্যান্ড, নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্ক, আয়ারল্যান্ড, ফ্রান্স, কানাডা, জার্মানি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশের হিউম্যান সেক্সুয়ালিটি ফিল্ডের উপস্থিত নেতৃবৃন্দের কাছে ঘোষণা করেন যে, কিনসির এই গবেষণা শিশুদের ওপর ‘পারমাণবিক বোমা’-র চেয়েও ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে। তিনি তাদেরকে বলছিলেন কীভাবে তারা চুপচাপ বসে আছে!’

জন মানি একই সম্মেলনে মূল বক্তৃতা দিয়েছিলেন। তিনি শুনেছিলেন কনফারেন্সে কি ঘটেছিল। এই সময় তিনি শিশুদের রক্ষায় জোর গলায় কথা বলতে পারতেন। তিনি অপ্রাপ্তবয়স্কদের প্রতি যৌননিপীড়নকে নিন্দা জানাতে পারতেন। কোনো বৈজ্ঞানিক উন্নতির বদলে নিপীড়নকে প্রশ্রয় দেওয়া যায় না। অনেক কিছুই করার সক্ষমতা তাঁর ছিল। এর বদলে মানি মূল কনফারেন্স রুমের দরজা খুলে পডিয়ামে চলে যান। মডারেটরের কাছ থেকে একটি মাইক্রোফোন নিয়ে উদ্বিগ্ন জনতার উদ্দেশে কথা বলেন।

জন মানি রেইসম্যানকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘যদি এই মহিলাকে চালিয়ে যেতে দেওয়া হয় তাহলে যৌনবিদ্যা ও যৌনশিক্ষা ২০০ বছর পিছিয়ে যাবে।’ জন মানি বিশেষ করে, যৌনবিকৃতির ধারণা মুছে ফেলার চেষ্টা করেছিলেন। এমনকি যৌনতাসংক্রান্ত গবেষণার ক্ষেত্রকে রক্ষা করার জন্য ১৯৮১ সালে জেরুজালেমে অসংখ্য দর্শকের সামনে প্রকাশ্যে শিশুদের যৌননির্যাতনের পক্ষে কথা বলেন।

লিঙ্গপরিবর্তন অপারেশনের উত্থান

যেসব যৌনআচরণকে অস্বাভাবিক ও অনৈতিক মনে করা হতো মানি সেগুলোকে স্বাভাবিক করতে চেয়েছিলেন। লিঙ্গপরিবর্তন অপারেশনের ক্ষেত্রে তিনি এটি করতে সফল হন। একসময় এটাকে অদ্ভুত বা ভীতিকর হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু পরবর্তীকালে এটি গ্রহণযোগ্যতা পায়।

জন মানি লিঙ্গপরিবর্তনের অপারেশন করা প্রথম ব্যক্তিত্ব ছিলেন না। তবে তিনি এই ধারণাটিকে আরো বেশি গ্রহণযোগ্য করে তোলার ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা রাখেন। তিনি জনস হপকিন্স হাসপাতালের সাথে যুক্ত হন। তিনি ১৯৫১ সালে সেখানে কাজ শুরু করেন। ২০০৬ সাল পর্যন্ত সেখানে কর্মরত ছিলেন। ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সেখানে অধ্যাপনা করেছেন তিনি।

১৯৬০-এর দশকে, জনস হপকিন্স এমন একটি জায়গা ছিল যেখানে জন মানির মতো গবেষকরা ট্রান্সসেক্সুয়ালিজম নিয়ে গবেষণা করছিলেন। ডাক্তাররা এমন ব্যক্তিদের চিকিৎসা করেছিল যারা এমন শারীরিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন যেটা সাধারণ পুরুষ বা নারীর বৈশিষ্ট্যের সাথে পুরোপুরি খাপ খায় না।৩৫ সেই সময়ে, যৌনতার প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসছিল। ফলে হাসপাতালগুলোও লিঙ্গপরিবর্তনের অস্ত্রপচার নিয়ে কাজ করার গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে যাচ্ছিল।৩৬

১৯৬৫ সালে জন মানি এবং ডাক্তারদের একটি দল, হ্যারি বেঞ্জামিনের সহায়তায় অ্যাভন উইলসন নামে একজন ব্যক্তির উপর তাদের প্রথম লিঙ্গ-পরিবর্তন অস্ত্রোপচার করেন। অ্যাভন নিজেকে নারী হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। নিজে ডাক্তার না হয়েও অস্ত্রোপচারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন মানি। উইলসনের অস্ত্রোপচারকে সেই সময়ে যুগান্তকারী বলে মনে করা হয়েছিল।৩৭ অস্ত্রোপচারটি সফল হয় (অর্থাৎ, মি. উইলসন যা চেয়েছিলেন সেটাই অর্জন করেন)। তবে উইলসন অস্ত্রোপচার সম্পর্কে কেমন অনুভব করেছিলেন বা তিনি অস্ত্রোপচারের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কিরূপ অনুভব করেছিলেন সে সম্পর্কে তেমন জানা যায় না। অস্ত্রোপচার-পরবর্তী জীবন সম্পর্কেও বেশি কিছু জানা যায় না। তবে তিনি ওয়ারেন কম্বস নামে একজন সঙ্গীতশিল্পীকে বিয়ে করেছিলেন।৩৮

১৯৬৬ সালে জন মানি ও তাঁর দল জনস হপকিন্স জেন্ডার আইডেন্টিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করেন। ফান্ডিং করেন রিড এরিকসন নামক একজন ট্রান্সজেন্ডার মহিলা।৩৯ যদিও তারা আগের বছর একটি লিঙ্গপরিবর্তন সার্জারি পরিচালনা করেছিলেন, তবুও সেই সময়ে এই ধরনের সার্জারিগুলো মেডিকেল কমিউনিটি ও সমাজে অপরিচিত ও বিতর্কিত ছিল। যাহোক, মানির প্রভাব ও প্রচেষ্টার কারণে জনস হপকিন্স জেন্ডার আইডেন্টিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা পায়।

হ্যারি বেঞ্জামিনের মতে, হাসপাতালটি যেন লিঙ্গপরিবর্তনের অস্ত্রোপচার করে, এই বিষয়ে হাসপাতালকে সমর্থন করাতে মানি গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ফলে পরবর্তীকালে হাসপাতালটি এই ফিল্ডে শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।৪০

ক্লিনিকটি দ্রুত জনপ্রিয়তা পায়। অনেকেই সেখানে লিঙ্গপরিবর্তনের অস্ত্রোপচার করতে চায়। মাত্র আড়াই বছরে অস্ত্রোপচারের জন্য প্রায় দুই হাজার আবেদন পান চিকিৎসকরা! যাহোক, তারা এতগুলো অপারেশন করতে প্রস্তুত বা ইচ্ছুক ছিলেন না। মাত্র ২৪টি সার্জারি করা হয়।৪১ ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হচ্ছে, ২০০০টি সার্জারির আবেদনের মধ্যে মাত্র এক-পঞ্চমাংশ ছিল নারীদের কাছ থেকে যারা পুরুষাঙ্গ পেতে চেয়েছিল। বাকিগুলো এসেছিল নারী হতে চাওয়া পুরুষদের কাছ থেকে। এটি ইঙ্গিত করে যে, সামাজিক চাপের প্রভাব ব্যতীতই অনেক পুরুষ নারী হতে চায়।

জনস হপকিন্স জেন্ডার আইডেন্টিটি ক্লিনিকের খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ১৯৬৬ সালের অক্টোবরে নিউইয়র্ক ডেইলি নিউজ অ্যাভন সম্পর্কে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করে। তিনি জনস হপকিন্স হাসপাতালে লিঙ্গপরিবর্তনের অস্ত্রোপচার করেছিলেন। হাসপাতাল নিশ্চিত করে যে এরকম একটি অস্ত্রোপচার হয়েছে। মিডিয়া এই খবরে খুব আগ্রহী হয়ে ওঠে।৪২ পরিস্থিতির সুযোগ নিতে জনস হপকিন্সের ডাক্তাররা নিউইয়র্ক টাইমস-এ তাদের বন্ধু টমাস বাকলির সাথে যোগাযোগ করেন। বাকলি যেদিন তার রিপোর্ট লিখেছিলেন সেদিনই তারা একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন। জনস হপকিন্স হাসপাতাল যে গবেষণা ও শিক্ষার জন্য একটি নেতৃস্থানীয় প্রতিষ্ঠান এবং প্রথম আমেরিকান হাসপাতাল যারা অফিশিয়ালি লিঙ্গ-পরিবর্তনের সার্জারি করে– এই বিষয়টি প্রেস রিলিজে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

নিউইয়র্ক টাইমস জনস হপকিন্স হাসপাতালের লিঙ্গপরিবর্তনের অস্ত্রোপচারকে সমর্থন করার বিষয়ে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করার পরে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে অন্য অনেক সংবাদপত্রও একই রকম খবর ছাপায়। মিডিয়া কভারেজ লিঙ্গপরিবর্তনের অস্ত্রোপচারকে জনসাধারণের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলতে সাহায্য করে। জনস হপকিন্সের ডাক্তাররা মিডিয়া কভারেজ দেখে খুশি হয়েছিলেন এবং তারা বলেছিলেন যে তাদের পরিকল্পনা প্রত্যাশানুরূপভাবে কাজ করেছে। নিউইয়র্ক টাইমস নিবন্ধটি প্রকাশ করায় তারা খুশি হয়, যেহেতু এটা একটা সম্মানিত সংবাদপত্র । অন্যান্য সংবাদপত্রও তার নেতৃত্ব অনুসরণ করে।৪৩

ইতিবাচক প্রেস কভারেজ পাওয়ার পর এর প্রভাব অবিলম্বে পড়তে শুরু করে। ইউনিভার্সিটি অব মিনেসোটা মেডিকেল স্কুলে একটি নতুন জেন্ডার ক্লিনিক তৈরি করা হয়। জনস হপকিন্সকে কতটা ভালভাবে গ্রহণ করা হয়েছিল সেটা দেখার পরে তারা নিজেরাও মিডিয়ার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়, যেমন নর্থওয়েস্টার্ন, স্ট্যানফোর্ড এবং সিয়াটলের ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি কিছু দিন পর একই ধরনের প্রোগ্রাম অফার করা শুরু করে। মাত্র দশ বছরের মধ্যে আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাক্তাররা ১০০০টিরও বেশি লিঙ্গপরিবর্তনের সার্জারি করেছেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ২০টি কেন্দ্র ছিল যারা এই ধরনের সার্জারি করত৷৪৪

ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হচ্ছে, যখন জনস হপকিন্স ইনস্টিউট তাদেরই করা এক গবেষণায় দেখে যে লিঙ্গপরিবর্তনের অপারেশন রূপান্তরকামী মানুষদের কোনো উপকারে আসেনি তখন তারাই ক্লিনিকটা বন্ধ করে দেয়।৪৫ কিন্তু ততদিনে লিঙ্গপরিবর্তনের সার্জারি সাধারণ বিষয় হয়ে পড়েছিল। জনস হপকিন্স ততদিনে লিঙ্গপরিবর্তন সার্জারিকে এক প্রকার সামাজিক অনুমোদন দিয়ে ফেলেছিল। ফিরে আসার কোনো উপায় ছিল না।

আমি ড. বোয়ারসের সাথে কথা বলেছি। তিনি ক্যালিফোর্নিয়ায় তাঁর ক্লিনিকে একজন ট্রান্সজেন্ডার সার্জন হিসেবে কর্মরত। তিনি ড. স্ট্যানলি বিবারের কাছ থেকে এগুলো শিখেছিলেন। স্ট্যানলি ছিলেন তাঁর পরামর্শদাতা। ১৯৬৯ সালে তিনি প্রথম লিঙ্গপরিবর্তনের অস্ত্রোপচার করেন।৪৬ ড. বোয়ারস বলেন, ড. বিবারকে একজন সমাজকর্মী অস্ত্রোপচার করতে বলেন। সেই সময়ে এটি সম্পর্কে তেমন বিস্তারিত কিছু না জানা সত্ত্বেও তিনি সমাজকর্মীর কথা শুনেছিলেন এবং তার অবস্থার প্রতি অত্যন্ত সহানুভূতিশীল ছিলেন।

ডা. স্ট্যানলি বিবার নিউ মেক্সিকোর উত্তরে একটি ছোট শহর ত্রিনিদাদ, কলোরাডোতে কাজ করতেন। সেখানে তিনি লিঙ্গপরিবর্তনের অস্ত্রোপচার করেন। তার উদ্দেশ্য হচ্ছে ত্রিনিদাদকে ‘বিশ্বের লিঙ্গপরিবর্তন ক্যাপিটাল’ বানানো। বিশেষ করে জনস হপকিন্স ক্লিনিক বন্ধ হওয়ার পরে এটাই তার লক্ষ্য। যে গবেষণাটির কারণে জনস হপকিনস ক্লিনিকটি বন্ধ হয়ে যায় সেটার সমালোচনা করেন ড. বোয়ারস। এটাকে তিনি ‘প্রোগামটি বন্ধ করার রাজনৈতিক এজেন্ডা’ আখ্যা দেন। তিনি এর পেছনে ‘মৌলবাদী খ্রিস্টানদের’-কেও দায়ী করেন। আমার কাছে যেটা অদ্ভুত লেগেছে তা হল, ড. বোয়ারস খ্রিস্টান ধর্মের সমালোচনা করলেও শিশুকামের জন্য জন মানিকে তিরস্কার করেননি। হয়তো কোনো বিষয় তার কাছে সমালোচনার যোগ্য, কোনোটা নয়।

রেইমার জমজ

জন মানির জেন্ডার ক্লিনিক বন্ধ হওয়ার আগেই তিনি লম্বা এক ক্যারিয়ার পার করেছেন। কিছু পরেই জানতে পারলাম, সবচেয়ে ভয়ংকর ঘটনা শোনা তখনও আমার বাকি ছিল।

ড. গ্রসম্যান বলেন, ‘ড. মানির কাছে যে আসল কেইসটি আসে সেটাই তার ক্যারিয়ার তৈরি করে দেয়। কেইসটি ছিল রেইমার যমজদের নিয়ে। হয়তো তাদের সম্পর্কে আপনি শুনেছেন। বেশ বিখ্যাত কেইস। তবে যথেষ্ট বিখ্যাত না।’ রেইমার কেইসটি ছিল এক পরিবারের যাদের যমজ ছেলে ছিল। একেবারে স্বাভাবিক যমজ ছেলে। কিন্তু যমজদের বয়স যখন আট মাস চলে এবং তারা খৎনা করাতে যায়, তখন ব্রুস নামের প্রথম জমজের পুরুষাঙ্গ পুড়ে যায় যন্ত্রপাতির কোনো ত্রুটির কারণে। ফলে তার আর পুরুষাঙ্গ থাকে না।’ এক মূহুর্তের জন্য বিষয়টা ভেবেই কেঁপে উঠলাম।

ড. গ্রসম্যান বলতে থাকলেন, ‘পিতামাতারা সেখানেই থেমে গেলেন এবং দ্বিতীয় জমজের খৎনা করালেন না। তারা বুঝতে পারছিলেন না কি করবেন তারা। কীভাবে তারা শিশুটিকে বড় করবেন? এর কয়েক মাস পর তারা ড. মানির নাম শুনলেন। মানি দুনিয়াকে বলছিলেন যে, কোনো ছেলেকে যদি মেয়ের মতো করে বড় করা হয় তাহলে তারা সেভাবেই বেড়ে উঠবে, উলটোটাও সঠিক। বায়োলজিতে একটি বিতর্ক আছে– প্রকৃতি বনাম প্রতিপালন। অর্থাৎ, কেউ যেভাবে প্রতিপালিত হবে সে সেভাবেই বেড়ে উঠবে। তিনি বিশ্বাস করতেন যে লিঙ্গ যৌনাঙ্গের ওপর নির্ভর করে না। বরং যে কেউ নারী বা পুরুষ হতে পারে।’

রেইমার পরিবার যে মানিকে টিভিতে জনস হপকিনসে লিঙ্গপরিবর্তন সার্জারির ব্যাপারে কথা বলতে দেখে আশার আলো দেখেছিলেন তা অনুমেয়।৪৭ মানি তার সার্জারি নিয়ে আলোচনা করতেন This Hour Has Seven Days নামক একটি প্রোগ্রামে। তারা এক ট্রান্সসেক্সুয়াল ব্যক্তিকে আমন্ত্রণ জানায় যে নারী থেকে পুরুষ হয়েছে। লোকটি বলে, ‘সে আর আগে কখনোই পরিপূর্ণ বোধ করেনি।’৪৮ প্রোগ্রামটিতে, যেসব ইন্টারসেক্স ব্যক্তি এবং যারা নিজেদের মানসিকতার সাথে দেহকে খাপ খাওয়ানোর জন্য এখনো লিঙ্গপরিবর্তনের সার্জারি করেনি তাদেরকে ‘অসম্পূর্ণ’ বলে অভিহিত করেন।৪৯ তিনি তাদেরকে ‘সম্পূর্ণ’ করাকে নিজের এবং তার মতো অন্য সার্জনদের দায়িত্ব বলে মনে করতেন।

মানি যেহেতু জনস হপকিন্সের একজন সম্মানিত বিজ্ঞানী তাই এটা দেখে রেইমারদের ভয় কেটে যায় অনেকটাই। মানি নিজের মিথ্যাকে সুকৌশলে মানুষের মধ্যে প্রবেশ করাতে সক্ষম হয়েছিলেন। যদিও এই মিথ্যাকে তিনি নিজেই বিশ্বাস করতেন। তবে মিথ্যাকে বিশ্বাস করলেও সেটা মিথ্যাই। যদি New York Times-এর নিবন্ধ মোতাবেক শারীরিক গঠন, যৌনাঙ্গ বা ক্রোমোসোমের লিঙ্গ নির্ধারণে কোনো ভূমিকাই না থাকে, যদি আপনি কোনো ছেলেকে বলেন যে সে একটা মেয়ে এবং তাকে মেয়ের মতো করে বড় করেন, তাহলে সে বড় হয়ে মেয়েলি কাজই করতে চাইবে।’ এতে রেইমার পরিবারের সমস্যারও সমাধান হয়ে যাবে। ব্রুসের পুরুষ হওয়ার কোনো দরকারই নেই। তাকে মেয়েদের মতো বড় করা যাবে। সে কোনোদিনও পার্থক্য বুঝতে পারবে না।

রেইমাররা কানাডায় থাকত। ১৯৬৭ সালে– খৎনার দুর্ঘটনার প্রায় এক বছর পর এবং যমজদের জন্মের দেড় বছর পর রেইমারয়ারা বালটিমোর এবং জনস হপকিন্সে গিয়ে মানির সাথে দেখা করে। তাকে দিয়ে ব্রুসকে পরীক্ষা করায়।৫০ ‘[মানি] পিতামাতাকে বলেছিল, ‘কোনো সমস্যা নেই।’ ব্রুসকে নিয়ে যান। আপনি তার অণ্ডকোষ সরিয়ে ফেলবেন। তাকে খোঁজা করে দেবেন। আপনি তার নাম পরিবর্তন করবেন এবং তাকে একটি মেয়ের নাম দেবেন,’ ড. গ্রসম্যান বললেন আমাকে। তিনি বলতে থাকেন, ‘আপনি তাকে গোলাপি পোশাক পরাবেন, তাকে মেয়ে হিসেবে গড়ে তুলবেন, এবং কখনই তাকে বলবেন না যে সে পুরুষ হয়ে জন্মগ্রহণ করেছিল।’

ড. গ্রসম্যান বলেন, ‘এটা ছিল একটা পারফেক্ট কেইস। পারফেক্ট। আর কোথায় সে এরকম পারফেক্ট কেইস খুঁজে পাবে? কারণ এখানে দুটো ছেলে ছিল, দুটো ছোট ছেলে। তাদের বয়স এক থেকে দেড় বছর। দুজনেই জমজ। একই ক্রোমোজোম, একই জরায়ু থেকে আসা, একই পিতামাতার হাতে লালিতপালিত। একই প্রকৃতি এবং একই প্রতিপালন। তবে তাদের একজন গড়ে উঠবে মেয়ে হিসেবে [কারণ ড. মানি এটাই করতে বলেছেন।]’৫১

মানির মতে, সার্জারি দ্রুত করা প্রয়োজন। জেন্ডারের পেছনে সহজাত, প্রকৃতিগত কোনো ভিত্তি না থাকলেও তিন-চার বছর বয়সের দিকে ‘জেন্ডার আইডেন্টিটি গেইট’-এর কারণে লিঙ্গ অনেকটা চূড়ান্ত হয়ে যেতে পারে, এটা ছিল মানির বিশ্বাস।৫২ তিনি ১৯৬২ সালে লেখেন, ‘অপরিণত মস্তিষ্ক পরিবর্তন করা সহজ।’৫৩

এই কেইসের আগে বিজ্ঞানীদের গবেষণা পরিচালনা করার এবং ব্যাপক তদারকি ব্যতীতই চিকিৎসা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনেক স্বাধীনতা ছিল। মানি ছিলেন এর এক বিশিষ্ট উদাহরণ। তিনি প্রকৃতপক্ষে লিঙ্গ সম্পর্কে তাঁর তত্ত্ব এবং ধারণাগুলিতে দৃঢ় বিশ্বাস করতেন। সেগুলোকে নিছক অনুমান বা হাইপোথিসিস বলে মনে করেননি।

মানি তাঁর থিওরি সঠিক হওয়ার ব্যাপারে এতটাই নিশ্চিত ছিলেন যে তিনি তাঁর থিওরি প্রমাণ করার জন্য একটি অল্প বয়স্ক ছেলে, ব্রুসের জীবনের ঝুঁকি নিতে ইচ্ছুক ছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে ব্রুসের লিঙ্গপরিবর্তন করার জন্য অস্ত্রোপচার করাটাই ছিল সবচেয়ে মানবিক কাজ। এই মনোভাবেই বোঝা যায়, মানি তাঁর থিওরিকে প্রমাণ করতে কতদূর যেতে রাজি ছিলেন।৫৪

ফলে মাত্র ১৭ মাস বয়সে তরুণ ছোট্ট ব্রুসকে ছুরির নিচে নিজেকে সঁপে দিতে হয়। তাকে খোঁজা করা হয়। ডাক্তাররা তার সেখানে জরায়ুর মতো একটা জিনিস তৈরি করে দেয়। পিতামাতা তার নাম বদলে ‘ব্রেনডা’ রাখেন। তৎকালে বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রুস এখন একজন নারী।

ততক্ষণ পর্যন্ত সার্জারি ছিল যুদ্ধের অর্ধেকাংশ। অপারেশন দিয়ে কেবল তার লিঙ্গপরিবর্তন করা হয়েছে। এবার তার প্রতিপালন এবং এস্ট্রোজেন হরমোনের ডোজ৫৫ তার জেন্ডার পরিবর্তন করবে।৫৬ ব্রেন্ডা এবং তার জমজ ভাই প্রতি বছর মানির কাছে যেত মনিটরিংয়ের জন্য নয় বছর বয়স পর্যন্ত। প্রাথমিক অস্ত্রোপচার এবং চিকিৎসার পরেও ব্রেন্ডা (আগে ব্রুস) আরও কয়েক বছর ধরে মানির কাছে যেত। কিন্তু এই সেশনগুলো অনিয়মিতভাবে হতো। ১৯৭৮ সালে একটি সেশন চলার সময় ব্রেন্ডা আতঙ্কে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। সে সেক্স বা যৌনশিক্ষা সম্পর্কিত কোনো আলোচনাই করতে পারছিল না। এটা থেকে বোঝা যায়, তার ওপর যে আশা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং লিঙ্গপরিবর্তনের প্রক্রিয়া তার ওপর চরম মানসিক চাপ ও ট্রমা সৃষ্টি করেছিল।৫৭

ড. গ্রসম্যান আমাকে বলেন, ‘মানি যতবারই রেইমার পরিবারের সাথে দেখা করত এবং প্রশ্ন করত, সে তার প্রাপ্ত তথ্যগুলো ভুয়া নামে লিটারেচারে লিখে রাখত। সাইকোলজিক্যাল লিটারেচারে।’ ‘তিনি লেখেন, দশ বছর বয়স পর্যন্ত এটি পুরোপুরি ফল ছিল। তিনি ব্রেন্ডাকে ‘জোয়ান’ বলে অভিহিত করতেন। তিনি বলেন যে, নারী হওয়া নিয়ে জোয়ান পুরোপুরি স্বাভাবিক ছিল। সে সব দিক দিয়েই মেয়েলি ছিল। সে পুতুল নিয়ে খেলত, তার পোশাক ভালোবাসত ইত্যাদি ইত্যাদি।’ শেষে মানি লেখেন যে ব্রেন্ডা ‘টমবয়’-দের মতো বড় হলেও সে ‘মেয়েলি’।

অন্যান্য সূত্রমতে, মানি জোর দিয়ে বলতে থাকেন যে ব্রেন্ডার লিঙ্গ পুনর্নির্ধারণ সম্পূর্ণ সফল এবং এই ঘটনাটি তাঁর তত্ত্বের বৈধতার প্রমাণ। ১৯৭০-এর দশকের শেষের দিকে, অনেক সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানী লিঙ্গ ও পরিচয় সম্পর্কে তাদের নিজস্ব ধারণা সমর্থন করার জন্য মানির কাজকে প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।

তবে মানির তথ্যে কিছু ত্রুটি ছিল। উদাহরণস্বরূপ, তিনি বারবার ব্রেন্ডার ব্যাপারে সাধারণ তথ্যও ভুল লিখেছেন, যেমন ব্রেন্ডার বয়স। এসব ভুল থাকা সত্ত্বেও মানির ধারণাগুলো ব্যাপকভাবে গৃহীত হয় এবং অন্যান্য ফিল্ডের গবেষকরাও এই গবেষণা উদ্ধৃত করতে থাকে।৫৮ এখান থেকে বোঝা যায়, কোনো ব্যক্তির গবেষণা ও ধারণার ওপর অন্ধভাবে নির্ভর করা কতটা বিপজ্জনক। এ ছাড়া যে কোনো ফিল্ডে পুঙ্খানুপুঙ্খ ও সঠিক গবেষণার গুরুত্বও বোঝা যায়।৫৯

তবে ১৯৭৮-এর দিকে যখন রেইমাররা সিদ্ধান্ত নেয় যে তারা আর বালটিমোরে যাবে না, তখন মানিও রেইমার কেইস নিয়ে তেমন মন্তব্য করা বন্ধ করে দেন। তিনি প্রায় এক দশক ধরে নীরবতা বজিয়ে রাখেন।৬০

যখন মানি যমজদের সাথে সাক্ষাৎ বন্ধ করে দেন তখন সেসব বছরে কি ঘটেছিল?

দেখা যায়, ব্রেন্ডার ওপর করা লিঙ্গপরিবর্তনের সার্জারি এবং কাউন্সিলিং সফল হয়নি। রেইমারদের মানির সাথে দেখা করার এক বছর পর একটি ডকুমেন্টারি দল রিপোর্ট করে যে, মেয়ে হিসেবে জীবনযাপন করে ব্রেন্ডা সুখি ছিলেন না। এই পর্যায়েও ব্রেন্ডার পরিবার তাকে তার অতীতের ব্যাপারে সত্য কথা প্রকাশ করেনি। তবে তারা ডকুমেন্টারি দলকে বলে যে, তাদের সন্তানের ওপর মিথ্যা লিঙ্গপরিচয় চাপিয়ে দেওয়াটা কাজ করবে কী না সে ব্যাপারে তাদের যথেষ্ট সন্দেহ আছে।৬১ তৎকালীন লিঙ্গপরিচয়কেন্দ্রিক যেসব জেন্ডার থিওরি ছিল সেগুলোর প্রতিটিকেই বিতর্কিত করছিল ব্রেন্ডার অবস্থা। ব্রেন্ডার সাথে যা করা হয়েছিল তা যথেষ্ট নিষ্ঠুর ছিল। ব্রেন্ডাকে নারীর পরিচয় দেওয়া হলেও ব্রেন্ডা নিজেকে নারী হিসেবে চিহ্নিত করত না বরং সে পুরুষালি আচরণ করত। ডকুমেন্টারিতে বলা হয়, ব্রেন্ডার চালচলন ছিল পুরুষদের মতো। তিনি একজন মেকানিক হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন।৬২ তাকে সবাই মেয়ে বললেও কখনও তার মনে হয়নি যে সে একজন মেয়ে।৬৩

অবশেষে যখন ব্রেন্ডাকে তার অতীতের ব্যাপারে বলা হয়, তখন তিনি সাথে সাথে তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া মিথ্যা নারী পরিচয়কে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি পুরুষ হিসেবে জীবনযাপন শুরু করেন। তাকে পূর্বে যে এস্ট্রোজেন দেওয়া হয়েছিল সেটার বিপরীতে তিনি টেস্টোস্টেরন নেওয়া শুরু করেন। কৃত্রিমভাবে তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া স্তনও তিনি সরিয়ে ফেলেন। যে পুরুষাঙ্গ তিনি হারিয়ে ফেলেছিলেন সেটি ফিরে পেতে তিনি ফ্যালোপ্লাস্টি সার্জারি করেন। পরে তিনি এক মহিলাকে বিয়ে করেন এবং তার সন্তানদের দত্তক নেন।৬৪

পরে তিনি তার নাম পরিবর্তন করেন ‘ব্রুস’-এ নয় বরং ‘ডেভিড’-এ। ড. গ্রসম্যান বলেন, ‘প্রতিদিন তিনি নিজের বিরুদ্ধে লড়তেন। পুতুল খেলার বিরুদ্ধে লড়তেন, তিনি পুতুল নিয়ে খেলতে চাইতেন না। ড. মানি বলেছিলেন যে সবকিছু সফলভাবে হচ্ছিল; না, তিনি তার ভাইয়ের ট্রাক চুরি করে খেলতেন। তিনি স্কার্ট পরতে চাইতেন না। এমনকি তিনি দাঁড়িয়ে প্রসাব করতেন।’

তবে মানির নিগৃহীতের শিকার হওয়া ডেভিডই একমাত্র শিশু নয়। কিরা ট্রিয়া নামক এক মেয়ে জন মানির এক্সপেরিমেন্টের শিকার হয়েছিলেন। তিনি ২০০০ সালে মানির অপকর্মের বিরুদ্ধে সরব হন। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, তার মতো অন্য যেসব শিশুকে ‘অ-মানব’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল এবং এক্সপেরিমেন্টের শিকার হয়েছিল, তারা গবেষণার জন্য দরকারী ডেটা সরবরাহ করেনি। তিনি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে কথা বলেন।৬৫

এক ব্যক্তি নিজেকে চিহ্নিত করেন ‘অস্পষ্ট যৌনাঙ্গওয়ালা হিজড়া’ হিসেবে। তিনি এমন এক লেখকের সাথে অসম্মতি জানান যিনি জন মানির প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করেছিলেন। ব্যক্তিটি ব্যাখ্যা করেন যে, তিনিসহ আরো হাজার হাজার ইন্টারসেক্স ব্যক্তির জীবন জন মানির কাজের দ্বারা নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হয়েছে। তাই তারা জন মানিকে ক্ষমা করতে পারবেন না।৬৬

ডেভিড রেইমার বলেন, তার বিরুদ্ধে মানির করা অপরাধ কেবল তাকে খোঁজা করা এবং তাকে নারীত্ব আঁকড়ে ধরতে বাধ্য করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটি স্কুল অব লাইফ সায়েন্সেসের লেখক ফিল গেটানোর মতে, জন মানির গবেষণা ও চিকিৎসার অংশ হিসেবে ডেভিড রেইমার এবং তার যমজ ভাইকে একে অপরের যৌনাঙ্গ পরীক্ষা করতে হতো এবং তাদেরকে একে অপরের সাথে যৌন কার্যকলাপে লিপ্ত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হতো। ডেভিড রেইমার দাবি করেছেন, মানির চিকিৎসার অধিকাংশ জুড়েই ছিল দুজনকে একে অপরের সাথে যৌন কার্যকলাপ করতে বাধ্য করা।

মানি তাদেরকে যৌনমিলনের বিভিন্ন পজিশনে যেতে বাধ্য করতেন। যার মধ্যে মিশনারি পজিশনে গিয়ে লিঙ্গ প্রবেশ করানোর মতো বিষয়ও ছিল। মানি দাবি করেছেন, শিশুরা যেন যৌনতাকে অন্বেষণ করতে পারে সে জন্যই এটা করা। রেইমার এমনকি বলেন, তিনি এবং তার ভাইকে এসব কাজ করতে বাধ্য করানোর সময় মানি তাদের ছবি তোলে। মানি এবং তার প্রায় ছয়জন সহকর্মী সামনাসামনি এসব দেখত।

গেটানো লেখেন, ‘রেইমার বা তার ভাই মানির কোনো আদেশের প্রতিরোধ করতে গেলে মানির কাছ থেকে ক্ষোভ ও গালাগালির শিকার হতো। অন্যদিকে মানি অত্যন্ত নরম গলায় তাদের পিতামাতার সাথে কথা বলত।’ এতকিছু করা হয়েছিল যখন তারা সবেমাত্র স্কুলে যাওয়া শুরু করেছিল।৬৭

অপ্রতিরোধযোগ্যকে প্রতিরোধ করা

এসব বিজ্ঞান না। এগুলো শুনে মনে হবে একজন ব্যক্তি তার যৌন ফ্যান্টাসিকে তৃপ্ত করছে। জন মানি রেইমার যমজ সন্তানদের সাথে যা করেছিলেন তা নাৎসি ডাক্তার জোসেফ মেঙ্গেলের করা ভয়ঙ্কর পরীক্ষার কথা মনে করিয়ে দেয়। জেন্ডার আইডেন্টিটি ক্লিনিক বন্ধ হওয়ার পর, মানি-এর অন্যতম বন্ধু ড. ফ্রেড বার্লিন জনস হপকিন্সে একটি যৌনরোগের ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করেন। এটিকে মানির কাজের সম্প্রসারণ হিসেবে দেখা হয়।৬৮ সেই বার্লিনের অফিসে শিশু অ্যাডলফ হিটলারের ছবি ছিল।

একটি সাক্ষাৎকারে ড. ফ্রেড বার্লিন ব্যাখ্যা করেছিলেন কেন তিনি তার অফিসে শিশু অ্যাডলফ হিটলারের একটি ছবি রেখেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এটি তার জীবনের অভিজ্ঞতা ও জীববিজ্ঞান সম্পর্কে প্রশ্ন তোলে। তবে আমি ছবির উপস্থিতি নিয়ে অস্বস্তিবোধ করছিলাম। এরপর তখন ড. ফোর্সিয়ারকে রেইমার যমজ এবং জন মানির সাথে তাদের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তখন ড. ফোর্সিয়ার কেইসটি সম্পর্কে অবগত থাকা সত্ত্বেও দ্রুত আলোচ্য বিষয় পরিবর্তন করেন।

ড. ফোর্সিয়ার স্বীকার করেন যে, কীভাবে মেডিকেল প্রোফেশনালরা স্বার্থপর উদ্দেশ্যে তথ্যের অপব্যবহার করে ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষতি করতে পারে জন মানি তার অন্যতম উদাহরণ। তবে কেবল ড. ফোর্সিয়ারই জন মানিকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করেননি। মানি অনেক বছর ব্যয় করেছেন মানুষকে বিশ্বাস করাতে যে রেইমার কেইস ছিল একটি পরিপূর্ণ সফলতা। তবে কখনোই তার এই কাজকে তখন চ্যালেঞ্জ করা হয়নি। যখন তাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়, তখন তিনি দাবি করেন যে এসব সমালোচনাগুলোর ভিত্তি ছিল নারীবাদবিরোধিতা এবং ট্রান্সবিরোধিতা।৬৯

ড. গ্রসম্যান ভাবতেন, জন মানির কি সামনাসামনি এসে জেন্ডারের ব্যাপারে যে তার আইডিয়া ভুল এবং ডেভিড রেইমারের সাথে তার কৃত গবেষণা যে অন্যায় ছিল এটা স্বীকার করার মতো সাহসিকতা ও সততা তার ছিল কী না। তিনি কখনোই জনসম্মুখে স্বীকার করেননি যে তিনি ভুল করেছেন। কখনো বলেননি যে, প্রকৃতি একটি ব্যক্তির লিঙ্গপরিচয় নির্ধারণে কতটা ভূমিকা রাখে।

কিছু লোক ট্রান্সজেন্ডার আন্দোলন এবং জন মানির খ্যাতি রক্ষা করার জন্য জন মানির পক্ষে নানা অজুহাত তৈরি করে বা রেইমার কেইসটিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে। যেসব বই থেকে আমি মানির ব্যাপারে জেনেছি সেগুলোর লেখকেরাও তার কর্মজীবনের নৈতিক বিতর্কগুলো স্বীকার করেছেন। তবে তারা এই বিষয়ে খুব বেশি বিশদ আলোচনা করেননি।৭০

কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির মেডিকেল সাইকোলজির অধ্যাপক ড. আঙ্কে ইহারহার্ড জন মানির মৃত্যুর এক বছর পর তাঁর ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং তাঁকে একজন নেতা ও অরিজিনাল চিন্তাবিদ বলে অভিহিত করেন। তিনি জন মানির প্রাপ্ত অসংখ্য পুরস্কারের তালিকা করেছেন। তিনি বলেন, জন মানি ৬৫টি অনার, অ্যাওয়ার্ড, লেকচারশিপ ও ডিগ্রি অর্জন করেন। তবে তিনি রেইমার যমজদের কথা উল্লেখ করেননি। মানির কাজের প্রতি যেকোনো সমালোচনাকে তিনি নিছক ব্যক্তিগত আক্রমণ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে মানি তার বোধগম্য, দক্ষতা, জ্ঞান, সহনশীলতা এবং কাউন্সেলিংয়ের দিক দিয়ে ব্যতিক্রমী।৭১

Salon নামক একটি প্রকাশনা যা নারীবাদ ও ট্রান্সজেন্ডার মতাদর্শকে সমর্থন করে তারা এই দাবি করে যে, যারা মানির বিরুদ্ধে সমালোচনা করে তারা সম্ভবত তাঁর কাজকে অসম্মানিত করা বা তাঁকে একজন কাপুরুষ হিসেবে চিত্রিত করার জন্যই এটি করে। মানির আইডিয়াগুলো সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা খুব কঠিন। প্রচেষ্টা ছিল এবং তার ধারণাগুলো বোঝার পক্ষে খুব জটিল ছিল।৭২

২০ বছরেরও আগে রেইমার কেসটি নিয়ে জানাজানি হলে প্রথম প্রথম অনেকেই ড. মানির কাজটি পছন্দ করেননি। তবে অধিকাংশ মানুষই ভুলে গেছে মানি কি করেছিলেন। কিছু বিশেষজ্ঞ যৌন গবেষণার ক্ষেত্রে মানির কাজকে স্বীকৃতি দিতে শুরু করেছেন।৭৩ তারা বিশ্বাস করেন, ড. মানি একটি অবিশ্বাস্য অবদান রেখেছেন এবং তিনি এমন প্রভাব ফেলেছেন যা তিনি সম্ভবত নিজেও ভাবেননি যে এতটা প্রভাব ফেলতে পারবেন।

আমি জেন্ডার থিওরি এবং নারী বলতে কি বোঝায় কী তা সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলাম। এটি করার জন্য আমি এর ইতিহাস ঘাঁটি। আমি দেখেছি যে মানুষ সাধারণত এই ইতিহাস সম্পর্কে কথা বলতে চায় না কারণ এটি অত্যন্ত বিব্রতকর, ভুল এবং ঘৃণ্য। কিছু লোক এমনকি এটাকে বিকৃত বা নোংরাও বলতে পারে। যদিও এটি এমন এক শব্দ যা জেন্ডার থিওরিস্টরা পছন্দ করে না।

আমি এখন পর্যন্ত যা জানলাম তা হল, জেন্ডার থিওরি আলফ্রেড কিনসি ও জন মানির মতো লোকদের তৈরি। তারা এমনসব গবেষণা করেছিলেন যেগুলোকে কোনোভাবেই প্রকৃত বিজ্ঞান বলা যায় না। যৌনতা সম্পর্কে মানুষের চিন্তাভাবনা পরিবর্তন করতে এবং ভুল জিনিসগুলোকে সমাজের কাছে স্বাভাবিক করতে তারা তাদের শক্তি ও প্রভাব খাটায়। তাদের এসব কাজ লিঙ্গপরিবর্তনের সার্জারি, শিশুকাম এবং শিশুদের যৌনায়িতকরণের মতো বিকৃত কাজগুলোর দরজা খুলে দেয়।

প্রথম প্রথম সমাজে তাদের কাজগুলোকে ঘৃণ্য চোখে দেখা হলেও ধীরে ধীরে সেগুলো গ্রহণযোগ্যতা পেতে শুরু করে। এটা কীভাবে ঘটেছিল তা বোঝার জন্য আমি বামদের ব্যবহৃত সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ারের দিকে নজর দেই: শিক্ষাব্যবস্থা।

 

প্রিয় পাঠক, ট্রান্সজেন্ডারিজমের করাল গ্রাস বইটির ওয়েব ভার্সন উন্মোক্ত করে দেওয়া হয়েছে বইটি প্রকাশের মাত্র দুইদিনের মধ্যেই। একটি বই প্রকাশের পেছনে অসংখ্য মানুষের সময়, শ্রম ও মেধার সমন্বয় থাকে। থাকে বড় একটি ইনভেস্টমেন্ট। বইটির পিডিএফ বা ওয়েব ভার্সনে প্রকাশক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হোন। তাই অনুরোধ, যদি সামর্থ্য থাকে তবে বইটির একটি কপি ক্রয় করবেন। অর্ডার করতে ক্লিক করুন

 

অধ্যায় ২: জেন্ডার থিওরির ইতিহাস <<আগের অধ্যায়             পরের অধ্যায়>> অধ্যায় ৪: কীভাবে কারিকুলামে জেন্ডার থিওরি ঢুকে গেলো

Book: ট্রান্সজেন্ডারিজমের করাল গ্রাস Tags:

This entry was posted in . Bookmark the permalink.