ট্রান্সজেন্ডারিজমের করাল গ্রাস: অধ্যায় ১

ট্রান্সজেন্ডারিজমের করাল গ্রাস: অধ্যায় ১

সূচিপত্র

ভূমিকা
অধ্যায় ১: একটি সহজ প্রশ্ন
অধ্যায় ২: জেন্ডার থিওরির ইতিহাস
অধ্যায় ৩: জন মানি
অধ্যায় ৪: কীভাবে কারিকুলামে জেন্ডার থিওরি ঢুকে গেলো
অধ্যায় ৫: ট্রান্সজেন্ডাররা যেভাবে সব দখল করে নিলো
অধ্যায় ৬: ট্রানজিশনের প্রতিশ্রুতি
অধ্যায় ৭: তাসের ঘরের পতন
অধ্যায় ৮: ট্রান্সজেন্ডার সাংস্কৃতিক সংঘাত
অধ্যায় ৯: গোলাপি পুলিশ স্টেটের বুটের চাপায় ধ্বংস
অধ্যায় ১০: বিদ্রোহ
উপসংহার: আফ্রিকা
কিন্তু
রেফারেন্স

 

অধ্যায়: ১

একটি সহজ প্রশ্ন

আমি একজন উলঙ্গ লোকের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। আমি কখনো ভাবিনি আমার ক্যারিয়ার এমন হবে। কিন্তু আমি সব রকমের চেষ্টা করার ব্যাপারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলাম।

লোকটি বললো, ‘একজন ছেষট্টি বছরের বৃদ্ধ মানুষ হিসেবে আমার মনে হয় যে, কিছু বৈশিষ্ট্য আছে যা একজন নারীকে শারীরিকভাবে নারী করে তোলে।’

আমি সানফ্রান্সিসকোর ক্যাস্ট্রো ডিসট্রিক্টে ছিলাম। এখানেই সম্ভবত আমেরিকার সবচেয়ে বেশি অদ্ভুত মানুষ বাস করে। এই শহরের প্রতিটা জায়গায় উড়ছিল রেইনবো ফ্ল্যাগ। আর এত নোংরা আবর্জনা! সৌভাগ্যবশত, আমরা রাস্তার ছোট্ট যেই কোণটিতে দাঁড়িয়ে ছিলাম মানুষের মলমূত্র, আবর্জনা, সুঁচ এসব ছিল না। আর সত্যি বলতে, আমি যে লোকটির সাথে কথা বলছিলাম তিনি সম্পূর্ণ উলঙ্গও ছিলেন না। একটি মোজা পরে ছিলেন তিনি। হ্যাঁ, কেবল এক পায়ে একটি মোজা।

‘নারীদের এমন কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে যেগুলোর প্রতি আমি আকৃষ্ট আর সেগুলো…’ লোকটি একটু থেমে আবার বললেন, ‘আমি সম্ভবত উত্তরটি দিতে পারবো না।’

এই উত্তর নিয়ে ভোগান্তিতে পড়া মানুষ কেবল এই লোকটিই না।

আমি একটি ডকুমেন্টারি ক্রু জোগাড় করেছিলাম এবং যাকেই পাচ্ছিলাম তাকেই একটি প্রশ্ন করছিলাম। আমি মনে করেছিলাম প্রশ্নটি অযৌক্তিক রকম এবং অপমানজনক রকমের সহজ; আর তা হলো: What is a woman? নারী কী? তবুও দ্বিধাদ্বন্দ্ব বা ভয়, কখনো কখনো হয়ত রাগবশত প্রায় কেউই এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেননি।

আমি নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ারে গিয়েছিলাম এই আশা নিয়ে যে, দেশের অপরপ্রান্তের কেউ হয়তো আমাকে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে সাহায্য করতে পারেন।

আমি রাস্তায় একটি লোককে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ঠিক কোন জিনিসটি নির্দিষ্টভাবে একজন মানুষকে নারী করে তোলে?’ লোকটি বললো, ‘আমার কী উত্তর দেওয়া উচিৎ আমি বুঝতে পারছি না’।

‘আচ্ছা, ঠিক আছে।’

 আমি ঘুরে দেখলাম এক দম্পতি হেঁটে যাচ্ছে। আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করলাম যে, আমি একসাথে দুজন লোক পেয়ে গেছি। এরা হয়তো উত্তর দিতে পারবেন। একই প্রশ্ন আমি তাদেরকেও জিজ্ঞেস করলাম।

‘হুম…এটা একটা কঠিন প্রশ্ন বটে’, মহিলা বললেন।

‘প্রশ্নটা কি আসলেই কঠিন?’ আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম।

‘হ্যাঁ,’ তিনি দীর্ঘ বিরতি দিয়ে বললেন।

‘কেন কঠিন?’ আমি আবার প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলাম।

মহিলা উত্তর দিলেন, ‘কারণ আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি, লিঙ্গের চূড়ান্ত কোনো সংজ্ঞা নেই, থাকে না। তবে আমি মনে করি সেক্স এবং জেন্ডারের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তাই আমি বলতে পারছি না যে, কোনো নারীকে সংজ্ঞায়িত করার কোনো নিখুঁত পদ্ধতি অথবা উপায় আছে কিনা।’

তবে প্রশ্ন জাগে নারী-অধিকার, নারী-সমস্যা, নারী-পণ্য, নারী-পোশাক, নারী-সাহিত্য, নারী-অধ্যয়ন বা নারী-মার্চ এগুলোর মানে আসলে কি। আমি আমার প্রচেষ্টা জারি রাখলাম।

‘নারী কী?’ ক্যালিফোর্নিয়ার হলিউডের রাস্তায় হাঁটতে থাকা এক মহিলাকে জিজ্ঞাসা করলাম।

‘হুম…’ তিনি দীর্ঘ বিরতি দিয়ে বলা শুরু করলেন, ‘এটা একটি পছন্দ। ঠিক পছন্দও নয়, একটা বিকল্পের মতো। যেমন, আমি মনে করি এই ধরনের পরিচয় আপনার জন্মের মুহূর্ত থেকেই নির্ধারিত নয়। আপনি এই ক্ষেত্রে মুক্ত, স্বাধীন।’

কি থেকে মুক্ত, আমি ভাবলাম। আমি এখনো আমার প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাইনি। আরো চেষ্টা করতে লাগলাম।

‘নারী কী?’ টেনেসির ন্যাশভিলের এক মহিলাকে জিজ্ঞেস করলাম।

তিনি উত্তর দিলেন, ‘একজন নারী হচ্ছে সে, যে সুন্দর সাজতে পছন্দ করে এবং নিজেকে কমনীয় মনে করে।’

আমি বললাম, ‘আমি সুন্দর এবং কমনীয়, তাহলে আমিও কি একজন নারী হতে পারি?’

তিনি উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ। আপনিও নারী হতে পারেন, যদি চান। ’

আমি অন্য মহিলার কাছে গেলাম। তার নারী হওয়ার ব্যাপারে আমি আসলে নিশ্চিত ছিলাম না। তাকে দেখতে মহিলাদের মতোই লাগছিল, কথাবার্তাও মহিলাদের মতো। কিন্তু আমি জিজ্ঞেস করিনি তিনি নিজেকে সুন্দরী এবং কমনীয় মনে করেন কী না। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি কীভাবে ‘নারী’ শব্দটাকে সংজ্ঞায়িত করবেন?’

‘আমি মনে করি যে নিজেকে নারী হিসেবে পরিচয় দেয়, সে-ই নারী।’

‘যে কেউ মহিলা হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিলে সে নারী হয়ে যাবে?’ আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম।

‘হ্যাঁ’।

‘আচ্ছা, ঠিক আছে। এটাই উত্তর?’

‘হ্যাঁ, এটাই উত্তর!’

‘পরিচয়, কমনীয়তা, বিকল্প।’ ‘নারী কী অথবা কোন জিনিসটি কাউকে নারী বানায়’— এই প্রশ্নের উত্তর মনে হচ্ছে অসংখ্য। বেশ জটিল। তবে অদ্ভুতভাবে এই উত্তরগুলোর কোনোটিতেই জীববিজ্ঞান, ডিএনএ বা প্রজননের মতো শব্দগুলো নেই। যাদেরকে আমি এই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছি তাদের অনেকে জন্মের সাথে লিঙ্গের সম্পর্ককে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

আবার কেউ কেউ দাবি করেছেন, যে নারী (শব্দটি দ্বারা তারা কি বোঝাচ্ছেন, কে জানে) নয়, তার এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার কোনো অধিকার নেই।

এক সমকামী পুরুষের সাথে কথা বলা শেষ হলে পাশ থেকে একজন আমাকে কিছুটা দোষারোপের সুরে বললো, ‘আপনি একজন গে-কে জিজ্ঞেস করছেন যে, নারী কী?’লোকটি জৈবিকভাবে দেখতে পুরুষ। হাঁটাচলা, বেশভূষা মহিলাদের মতো। বুঝলাম তিনি তথাকথিত ট্রান্সনারী। সুঠাম দেহ, পরনে এক পার্পল ফেডোরা, গায়ে একটা কালো শার্ট যার উপরে ব্লক লেটারে লেখা ‘Eat. Halloween. Repeat.’ তিনি আমাকে বললেন, ‘আপনার নারী কি?’ এই প্রশ্ন করা উচিৎ একজন নারীকে, বিশেষ করে একজন ট্রান্সনারীকে।’

আমি সোজাসুজিভাবে তাকে বললাম, ‘আমি সব ধরনের লোকদের এই প্রশ্ন করছি। কারো কি এই ব্যাপারে কোনো মতামত থাকতে পারে না?’

তিনি বললেন, ‘কেবলমাত্র নারীদেরই এই ব্যাপারে জানা আছে। একজন গে কখনোই জানবে না নারী হওয়ার অর্থ কী।’

‘তার মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন, নারীর ব্যাপারে সমকামীদের কোনো মতামত থাকতে পারে না? তাহলে কি আপনি সানফ্রান্সিসকোর গে-দের বলে বেড়াবেন যে নারীদের ব্যাপারে তাদের কোনো কথা বলা নিষেধ?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।

 ‘না, কিন্তু বিষয়টা এমন না যে একজন গে কি হবে বা কি করবে সেটা নিয়ে আমি বলে বেড়াই,’ তিনি বললেন।

‘আপনি কি হতে পারবেন তা আমি জানতে চাইনি। কোন জিনিসটা কাউকে নারী বানায় এই বিষয়ে আমি মানুষের মতামত জিজ্ঞেস করছি,’ আমি পরিষ্কার করে বললাম।

তিনি উত্তর দিলেন, ‘একই কথা। কেউ যদি আমাকে এসে বলতো যে, গে কী?। তাহলে আমি তাকে বলতাম, ‘একজন গে-কে গিয়ে জিজ্ঞেস করো যে গে কী।’

আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি কি এটা বলতে চাচ্ছেন যে, যদি কেউ নারী না হয় তাহলে নারীদের ব্যাপারে তার কোনো মতামত থাকা উচিত না?’

তিনি বললেন, ‘একজন পুরুষ কোত্থেকে এবং কীভাবে একজন নারী সম্পর্কে মতামত দেওয়ার অধিকার পায়?’

আমি তাকে বললাম, ‘আপনি কি বিড়াল?’

‘না।’

‘আপনি কি আমাকে বলতে পারবেন বিড়াল কী?’

তিনি চোখ নিচে নামিয়ে নিলেন। কিছুক্ষণ পর চেহারায় বিকৃতির ছাপ নিয়ে সানগ্লাসের ফাঁক দিয়ে আমার ক্যামেরাম্যানের দিকে তাকালেন। তার চারপাশে বুদ্ধিজীবীতার যে দেয়াল তিনি গড়ে তুলেছেন সেটাই যেন তার শ্বাসরুদ্ধ করে দিচ্ছিল।

 ‘আমার এখানে আসাটাই ভুল হয়েছে। আমি দুঃখিত এখানে আসার জন্য,’ এই বলে তিনি হেঁটে চলে গেলেন।

আমি তাকে পেছন থেকে ডেকে প্রশ্ন করলাম, ‘আপনি কি আমাকে বলতে পারবেন নারী কী?’ তার কোনো উত্তর নেই।

 

এক মহাকাব্যিক যাত্রা

নারী কী? গত আট মাস আমি আমার সমস্ত মনোযোগ কেবল এই সাধারণ প্রশ্নটার উত্তর খুঁজতে নিবদ্ধ করেছি। সত্যি বলছি, এই প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করাও বিব্রতকর।

কিন্তু আমি আমার জীবনের অধিকাংশ সময় ভেবে এসেছি যে প্রত্যেকেই এই প্রশ্নের উত্তর জানেন।

আপনিও হয়তো এমনটাই ভেবেছেন এতদিন। বিষয়টা এমন না যে আমাদেরকে ওয়েবস্টার ডিকশনারি খুলে দেখতে হবে। নারী হচ্ছেন প্রাপ্তবয়স্ক মানবী। তার XX ক্রোমোজম আছে। তারা গর্ভধারণ করেন এবং বাচ্চা জন্ম দেন, লালন-পালন করেন। তারা পুরুষের চেয়ে বেশি বা কম ভালো নন। কিন্তু তারা দেখতে ঠিকই পুরুষের চেয়ে ভালো। আপনি যদি বিজ্ঞান নাও জানেন এবং একই শব্দও ব্যবহার না করেন, তারপরেও আপনি খুব সহজে একজন নারীকে সংজ্ঞায়িত করতে পারবেন। প্রাকৃতিকভাবেই তাদের চালচলন, আচার-আচরণ পুরুষের চেয়ে ভিন্ন হয়।

কিন্তু এই অতিসাধারণ এবং সহজ প্রশ্নের বিভ্রান্তিতে পড়ে আমাদের সমাজের ‘শিক্ষিত গোষ্ঠী’ একটা গোটা আদর্শই দাঁড় করিয়ে ফেলেছে। আর পুরো সমাজে এই বিভ্রান্তি ও সন্দেহ-সংশয় এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে এখন মুষ্টিমেয় সংখ্যক লোক পরিষ্কারভাবে চিন্তা করতে পারে।

এটা এমনও নয় যে, আপেক্ষিকতাবাদী লিঙ্গ-তাত্ত্বিকগণ এমন কঠিন সব সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয় সম্পর্কে জানেন, যা আমাদের মতো সেকেলে মানুষেরা বুঝতে পারবো না। বাস্তবতা হচ্ছে, এরা তাদের পুরো শিক্ষাজীবনে কমনসেন্সই শেখেনি।

ভয়ঙ্কর অভিন্নতার এই পৃথিবীর ক্ষমতাশালী এবং শক্তিশালী জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বরা আমাদেরকে বলা শুরু করলেন, একজন পুরুষ চাইলে নারী হতে পারবেন, একজন নারী চাইলে পুরুষ হতে পারবেন, আবার কেউ চাইলে এই দুয়ের মাঝামাঝি কিছু একটা হতে পারবেন অথবা এগুলোর বাইরের কিছু হতে পারবেন। কিন্তু আপনি যখন এদেরকে স্বাভাবিক তর্কের বাইরে গিয়ে যুক্তি দিয়ে একটু পেঁচিয়ে ধরবেন, এরা তখন আর কথা এগিয়ে নিতে পারেন না। নিজেদের মূর্খতা তখন এরা পরিষ্কার করে দেন।

আমরা সবাই জানি, নারী হওয়া একটা শারীরিক ব্যাপার। কিন্তু এই সমস্ত বিশেষজ্ঞ আমাদেরকে বলেন, বিষয়টা মোটেও তেমন নয়। যখন কারো নির্দিষ্ট কিছু নারী-বৈশিষ্ট্য থাকে তবে সে নারী। কিন্তু লৈঙ্গিক-বৈশিষ্ট্য প্রাকৃতিক নাকি সমাজসৃষ্ট? নাকি বিষয়টা ওই রাস্তায় মহিলাটি যেমন বলেছিল: কেউ যদি চিন্তা করে সে নারী, তাহলে সে নারী। কিন্তু আমি যদি নিজেকে সুপারম্যান ভাবি, তখন তো আমি সুপারম্যান হয়ে যাই না, আমি উড়তে পারি না। নিজেকে নারী ভাবলেই নারী হয়ে যাওয়া এবং সুপারম্যান ভাবলেই সুপারম্যান হয়ে যাওয়া— এই দুইয়ের মধ্যে কি কোনো পার্থক্য আছে? প্রত্যেক নারীই সুপারহিরো— এই ব্যাপারে সবাইকে নিশ্চয়তা না দিয়েই এমন তুলনা করা কি সেক্সিজমের কাতারে পড়ে? আর সুপারম্যান কি আসলে নারী?

আমি প্রায় সব ধরনের সাধারণ মানুষকেই এই ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছি, কিন্তু পরিষ্কার কোনো উত্তর পাইনি। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে, আমি বিশেষজ্ঞদের কাছে যাবো। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে তথাকথিত বিশেষজ্ঞদের মতামত আমি যত বেশি পড়তে লাগলাম, ততো বেশি আমি সন্দিহান এবং বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছিলাম। হঠাৎ করেই সম্পূর্ণ নতুন এক শব্দকোষ আমার সামনে উন্মোচিত হল। এসব শব্দ আমি আমার ইংরেজি ক্লাসেও কখনো শুনিনি। কতটা আত্মবিশ্বাসের সাথেই না শব্দগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে (আর যারা এসব বুঝতে পারছেন না তাদের নিন্দা নিন্দা করা হচ্ছে)! এসব দেখে আমার মাথা ঘোরা শুরু করলো। Gender Dysphoria, Gender reassignment, preferred pronouns, assigned sex, metidioplasty, she/her, he/him, em/eirs, ze/hir… ইত্যাদি বারবার চোখের সামনে ঘুরপাক খাচ্ছিল। বিভ্রান্তি এড়াতে মানুষজন সব জায়গায় নাম পুরুষ বহুবচন সর্বনাম ‘they’ বা ‘তাহাদের’-এর প্রচণ্ড রকম অপব্যবহার করা শুরু করলো।

মানসিক ভারসাম্য এবং পেছনে একটা শিরদাঁড়া আছে এমন যে কেউ বুঝতে পারবেন যে লিঙ্গ-তত্ত্ব আস্ত একটা ভুয়া জিনিস। কিন্তু মতাদর্শটিকে এত দ্রুত আর জোরালোভাবে প্রচার ও প্রসার করা হয়েছে যে, মানুষ ধারণা করতে শুরু করলো যে এর ভেতরে কিছু না কিছু তো আছে। কিন্তু বোঝা গেল যে সেই ধারণা ভুল।

আমাদের এই উত্তর-আধুনিক যুগে সত্যিকারের স্বাধীনতাকে দেখা হয় ‘অস্তিত্ব, অর্থ, মহাবিশ্ব এবং মানবজীবনের রহস্যকে নিজস্ব ধারণা অনুযায়ী সংজ্ঞায়িত করার ক্ষমতা’ হিসেবে। এ সময়ে লিঙ্গ-তত্ত্বের একটা নির্দিষ্ট আবেদন রয়েছে। স্ব-সংজ্ঞায়নের চূড়ান্ত রূপ হল কেবল অনুভূতির উপর ভিত্তি করে ঘোষণা দেওয়া যে আপনি পুরুষ, যদিও আপনার শরীরের প্রতিটি কোষ প্রমাণ করে যে আপনি একজন নারী। এই কাজটা এবং ট্রান্স হওয়া বামদের কাছে কুল সাজার আর নিজেকে ভিক্টিম হিসেবে উপস্থাপনের একটা দ্রুত এবং কার্যকর উপায়। বিভ্রান্ত কিশোর-কিশোরী তাদের দেহ সম্পর্কে অনিশ্চিত হয়ে পড়লে (আমরা একে বয়ঃসন্ধি বলতাম) এখন তারা দাবি করতে পারে যে তারা ট্রান্স। একবার নিজেকে ট্রান্স দাবি করলে তাদেরকে সাথে সাথেই স্বাগতম জানানো হয়। তাদের আশপাশে নামে-বেনামের অসংখ্য অনলাইন-অফলাইন কম্যুনিটি, প্লাটফর্ম এবং ব্যক্তিত্ব তাদেরকে তাদের ট্রানজিশনে সাহায্য করার জন্য ভিড় করে। সেই সাথে তাদেরকে বোঝায় যে, তারা নিষ্পেষিত, উপেক্ষিত।

যাহোক, জনপ্রিয়তা থাকলেও আদর্শটি আশ্চর্যজনকভাবে দুর্বল। এটা পপ মিউজিক বা ব্লকবাস্টার সিনেমার মতো। এগুলো ভালো ব্যবসা করে, টাকা আসে কিন্তু এগুলোর তাৎপর্যপূর্ণ কোনো অর্থ নেই। এর প্রবর্তক এবং সমর্থকরা জটিল জটিল সব টার্ম ব্যবহার করতে পারে, এলিট শ্রেণীর কাছে এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে গর্ব করতে পারে, বলতে পারে যে বিজ্ঞান তাদের পক্ষে। এত কিছু সত্ত্বেও তাদের কথা এবং আদর্শের কোনো সারবত্তা নেই।

এই জিনিসটাই আমাকে আমার চূড়ান্ত প্রশ্নে নিয়ে আসে। প্রশ্নটি সহজ, কিন্তু এর উত্তর লিঙ্গমতাদর্শীদের কাছে নেই। আমি জানি, কারণ আমি তাদের জিজ্ঞেস করেছি।

লিঙ্গতাত্ত্বিক বিশ্বের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, থেরাপিস্ট, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, মনোবিজ্ঞানী, রাজনীতিবিদ, অ্যাক্টিভিস্ট এবং ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের সাথেও আমি কথা বলেছি। আমি সরাসরি তাদের সামনে প্রশ্ন রেখেছি। আমি কোনো এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য তাদের কাছে যাইনি। গবেষণার স্বার্থে আমি তাদের কথা ফেইস ভ্যালুতেই নিতে রাজি ছিলাম। আমি চেয়েছিলাম তাদের উত্তরই তাদের পক্ষে কথা বলুক। কাউকে বিব্রত করার জন্যে, ফাঁদে ফেলার জন্য অথবা তাদেরকে শিক্ষা দেওয়ার কোনো উদ্দেশ্য আমার ছিল না।

যদি তারা এমন কিছু বলতো, তৎক্ষণাৎ যেটার মানে আমি বুঝছিলাম না, তাহলে আমি ধরে নিতাম যে এটা আমার বুঝার কমতি হতে পারে। তারা যা বলতে চাচ্ছে আমিই হয়তো সেটা বুঝতে অক্ষম।

কিন্তু সময় যত গড়াচ্ছিলো এবং ইন্টারভিউয়ের সংখ্যা যত বাড়তে লাগলো, আমি বুঝতে পারলাম যে সমস্যাটা আসলে আমার বোঝাতে ছিল না। তারা যা বলেন, তার আসলেই কোনো অর্থ নেই, অস্পষ্ট। কখনও কখনও কথা বলার অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা নিজেদের স্ববিরোধিতা প্রকাশ করে দেয়। তাদের শব্দগুলো এত অস্পষ্ট ছিল যে, তারা নিজেরাই সেগুলোকে পরে খারিজ করে দেয়। তাদের দাবি ছিল সাহসী, কিন্তু সেই দাবির ভিত্তি কি তা কখনোই বলতে পারেনি। হাতুড়ির আঘাত অথবা জোরে একটা ধাক্কাও লাগেনি, স্বাভাবিক একটা প্রশ্নেও তাদের যুক্তিগুলো ভেঙ্গে পড়ে। এর কারণ হচ্ছে তাদের এই লৈঙ্গিক মতাদর্শের মূল ভিত্তি ফাঁপা। বিভ্রান্তিকর শব্দের আড়ালে তারা সত্য লুকোতে চায়। কিন্তু আমি চাই না যে, আপনি আমার কথা গ্রহণ করে নিন। আমি চাই আপনি বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকেই শুনুন।

আপনি কি এখনও ‘নারী কী’ এই প্রশ্নটি নিয়ে ভাবছেন? তবে চলুন আমার সাথে। সেরাদের সেরা বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকেই এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে নেওয়া যাক।

প্রিয় পাঠক, ট্রান্সজেন্ডারিজমের করাল গ্রাস বইটির ওয়েব ভার্সন উন্মোক্ত করে দেওয়া হয়েছে বইটি প্রকাশের মাত্র দুইদিনের মধ্যেই। একটি বই প্রকাশের পেছনে অসংখ্য মানুষের সময়, শ্রম ও মেধার সমন্বয় থাকে। থাকে বড় একটি ইনভেস্টমেন্ট। বইটির পিডিএফ বা ওয়েব ভার্সনে প্রকাশক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হোন। তাই অনুরোধ, যদি সামর্থ্য থাকে তবে বইটির একটি কপি ক্রয় করবেন। অর্ডার করতে ক্লিক করুন

 

 ভূমিকা <<আগের অধ্যায়                                              পরের অধ্যায়>> অধ্যায় ২: জেন্ডার থিওরির ইতিহাস

Book: ট্রান্সজেন্ডারিজমের করাল গ্রাস Tags:

This entry was posted in . Bookmark the permalink.